সরকারি ছুটির দিন মানেই শিশুদের জন্য বিশেষ কিছু, আর বইমেলায় ‘শিশুপ্রহর’ হয়ে ওঠে তাদের আনন্দের ঠিকানা। এই সময় মেলা প্রাঙ্গণ পরিণত হয় শিশুদের মিলনমেলায়, যেখানে তারা বইয়ের জগতে ডুবে যায়। তবে এ বছর বই কেনার ধারা থাকলেও, প্রিয় ‘সিসিমপুর’ চরিত্রগুলোর অনুপস্থিতি অনেক শিশুর মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার বইমেলার ২২তম দিনে সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল ১১টায় মেলা শুরু হওয়ার পর থেকে সরকারি ছুটির সুবাদে ক্রমেই ভিড় বাড়তে থাকে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত ২২ দিনে বইমেলায় সর্বমোট ১ হাজার ৪৫১টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে শনিবার সংযুক্ত হয়েছে ১৪৪টি বই।
সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ চলাকালে শিশু কর্নারে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও খেলাধুলার আয়োজন ছিল। তবে ‘সিসিমপুর’ না থাকায় শিশুদের আগমন কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। বই কেনা মূল আকর্ষণ থাকলেও, শিশুদের জন্য আরও আয়োজন করা হলে মেলায় তাদের আগ্রহ বাড়বে এবং এটি একটি আনন্দময় অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে বলে জানান তারা।
প্রকাশক ও অভিভাবকদের মতে, শিশুদের জন্য বিকল্প আয়োজন করা হলে শিশুপ্রহর আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে। এমন উদ্যোগ থাকলে প্রতি সপ্তাহে শিশুদের বইমুখী করা সম্ভব হবে। এর আগে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার কারণে শিশুপ্রহর হয়নি, তবে তাতেও শিশুদের আনন্দে ব্যাঘাত ঘটেনি।
উত্তরা থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে মেলায় আসা দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজীম আহমাদ বলেন, আমি তিন বছর ধরে বইমেলায় আসছি সিসিমপুর দেখতে। এবার শিকুর সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না, তাই মন খারাপ।
বই কিনেছে কি না জানতে চাইলে তানজীম বলেন, প্রথমে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নেব, তারপর বাবা আমার পছন্দের বই কিনে দেবেন।
তানজীমের বাবা আরমানুল হক বলেন, আমরা প্রতি বছর ছেলেকে নিয়ে আসি। এখানে সে দারুণ সময় কাটায়। কিন্তু এবার সিসিমপুর না থাকায় কিছুটা হতাশ। শিশুদের আকৃষ্ট করতে এই আয়োজন চালু রাখা দরকার।
বাংলা একাডেমির মাসব্যাপী বইমেলার অংশ হিসেবে শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন ছিল। ছোট্ট আবির চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলে, আমি ভালো ছবি আঁকতে পারি, তাই এসেছি। আমার আঁকা ছবি বাবা-মাকে দেখাচ্ছি।
ময়ূরপঙ্খী প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মীরা জানান, সিসিমপুর থাকলে শিশুদের আগমন এবং বই বিক্রি আরও বাড়ত। শিশুরা আগে সিসিমপুরে আনন্দ করত, এরপর বই কিনত। এবার সেই পরিবেশ কিছুটা অনুজ্জ্বল মনে হচ্ছে।
প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক চন্দনা ম-ল বলেন, সিসিমপুর থাকলে শিশুদের আগ্রহ অনেক বেশি থাকে। তারা মেলায় বারবার আসতে চায়। শিশু কর্নার প্রাণবন্ত হলে বইমেলায় নতুন উদ্দীপনা যোগ হয়।
আজ রবিবার বিকেল ৩টায় বইমেলা শুরু হয়ে শেষ হবে রাত ৯টায়। তবে রাত ৮টার পরে কোনো দর্শনার্থীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে গতকাল শনিবার সকাল ১০টা ৩০মিনিটে শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা : ক-শাখায় ১ম হয়েছে সৈয়দ মু. আননুর হায়দার, ২য় হয়েছে মুহাম্মদ শাহরিয়াদ রহমান শিহাব, ৩য় হয়েছে ওয়াফিয়া নূর। খ-শাখায় ১ম হয়েছে আসবাহ রহমান, ২য় হয়েছে মুহাম্মদ শাহরিয়ার রহমান হাবিব, ৩য় হয়েছে দীপান্বিতা নন্দী। গ-শাখায় ১ম হয়েছে নুজহাত সালসাবিল মুন, ২য় হয়েছে জায়ান দেওয়ান, ৩য় হয়েছে মায়মুনা চৌধুরী ফাইজা।
শিশুকিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা : ক-শাখায় ১ম হয়েছে ফাবলিহা মোস্তাক আরওয়া, ২য় হয়েছে মাহরীন নাওয়ার এবং ৩য় হয়েছে মেহজারিন ইসলাম রূপকথা। খ-শাখায় ১ম হয়েছে বেহজারিন হাসান তারফি, ২য় হয়েছে শরীফ ইবতিহাজ ইসলাম এবং ৩য় হয়েছে সুনিপুণ বড়–য়া চৌধুরী এবং গ-শাখায় ১ম হয়েছে নুজহাত করিম ফাইজা, ২য় হয়েছে আবদুল্লাহ আল হাসান মাহি এবং ৩য় হয়েছে তাজকিয়া সমৃদ্ধি সূচনা।
শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা : ক-শাখায় ১ম হয়েছে আরোহী বর্ণমালা, ২য় হয়েছে লাইসা নূর বিনতে রহমান এবং ৩য় হয়েছে তাহানি আবসি। খ-শাখায় ১ম হয়েছে নীলান্তি নীলাম্বরি তিতির, ২য় হয়েছে সার্থক সাহা এবং ৩য় হয়েছে অনিরুদ্ধ ধর। গ-শাখায় ১ম হয়েছে রোদসী নূর সিদ্দিকী, ২য় হয়েছে তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় এবং ৩য় হয়েছে তোকি ইয়াসার আয়মান।