চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু রায়হানের বিরুদ্ধে এক দিনমজুরের জমির ক্ষতিপূরণের ২ কোটি ১১ লাখ টাকা প্রদানে গড়িমসি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাহেদ ইকবালসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে দিনমজুর মো. দেলোয়ার হোসেন তার বাবা মৃত মোহাম্মদ হোসেনের মালিকানাধীন ৭ শতক জমির ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ করতে ভুয়া ওয়ারিশ দেখিয়ে তিনটি নামজারি খতিয়ান সৃজনের প্রমাণও পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের পর উক্ত নামজারি খতিয়ান বাতিল করে মূল বিএস খতিয়ানে জমি ফেরতের আদেশ দিতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আবু রায়হানের দপ্তরে নামজারি পুনর্বিবেচনা মামলা (১৬৩/২৩-২৪) করেন মো. দেলোয়ার হোসেন। শুনানি শেষে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ওই তিনটি নামজারি খতিয়ান বাতিল করে বাদীর পিতার নামে মূল বিএস খতিয়ানে চূড়ান্ত প্রচারিত ৭ শতক জমি ফেরতের আদেশও দেন তৎকালীন এসিল্যান্ড আবু রায়হান।
সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে গত জানুয়ারিতে চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় যোগদান করেন আবু রায়হান। দেলোয়ার হোসেনের অভিযোগ, জমির প্রকৃত মালিক হিসেবে আদালতে সবকিছু প্রমাণিত হওয়ার পরও তাকে ক্ষতিপূরণের ওই টাকা প্রদানে নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন ম্যাজিস্ট্রেট আবু রায়হান। এদিকে ন্যাশনাল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ৬৩ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ের মামলায় আদালতের নির্দেশনা না মানায় উক্ত অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো. আবু রায়হানকে বুধবার ১৯ ফেব্রুয়ারি শোকজ করেছেন চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতের বিচারক মুজাহিদুর রহমান।
‘এই ম্যাজিস্ট্রেট এখন ওয়ারিশ সনদ জালিয়াত চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ করতে নানা বাহানা ও ফন্দি-ফিকির করছেন’ বলে অভিযোগ করেন দেলোয়ার হোসেন। চট্টগ্রামের জালালাবাদ ওয়ার্ডের কুলগাঁও মৌজায় সরকারি একটি প্রকল্পের জন্য তার বাবা মৃত মোহাম্মদ হোসেনের মালিকানাধীন বিএস মূল ১৩৯৪ নম্বর খতিয়ানের বিএস ১১৯৮ দাগের ৭ শতক জমি অধিগ্রহণ করে জেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক একেএম গোলাম মোর্শেদ বলেন, ‘মৃত মোহাম্মদ হোসেনের একমাত্র ওয়ারিশ হিসেবে মো. দেলোয়ার হোসেনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাকে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান করা যাচ্ছে না। কারণ এ বিষয়ে আদালতে একটি মামলা চলমান আছে।’ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো. আবু রায়হানের মোবাইলে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে এই প্রতিবেদক খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, গত বছরের ২ ডিসেম্বর নামজারি পুনর্বিবেচনার মামলার (১৬৩/২৩-২৪) নিষ্পত্তির জন্য শুনানি করেন হাটহাজারী উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সিনিয়র সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু রায়হান। এর আগে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ খাঁটি দেখিয়ে বিএস ১১৯৮ দাগের অনুকূলে জমি কর্তন করে সৃজন করা নামজারি জমাভাগ মামলা (২৯১২/২০১৮) বাতিল করে বিএস মূল খতিয়ানে (১৩৯৪) জায়গা পুনর্বহালের আবেদন করেন বাদী মো. দেলোয়ার হোসেন।
শুনানি শেষে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে সৃজন করা তিনটি নামজারি খতিয়ান (৬৭০১, ৫৭৪৩ ও ৫৭৫১) বাতিল করে বিএস ১১৯৮ দাগের ৭ শতক জমি বাদীর পিতা মৃত মোহাম্মদ হোসেনের নামে প্রচারিত মূল বিএস (১৩৯৪) খতিয়ানে ফেরতের আদেশ দেন তৎকালীন এসিল্যান্ড আবু রায়হান। আদেশের একাংশে বলা হয়, ‘প্রকৃত ওয়ারিশ দাবিদার হিসেবে বিবাদীদের আদালত থেকে সাকশেসন সার্টিফিকেট অথবা হলফনামা দাখিল করতে বলা হলে তারা ব্যর্থ হন। অন্যদিকে দাখিল করা কাগজপত্র পর্যালোচনায় ১৩৯৪ নম্বর খতিয়ানের অধীন ৭ শতক জমির রেকর্ডীয় মালিক হিসেবে বাদীর স্বত্ব প্রমাণিত হয়।’
২০২৩ সালের ১ নভেম্বর চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কুলগাঁও এলাকার বাসিন্দা মৃত মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে একমাত্র ওয়ারিশ দেলোয়ার হোসেন জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবাল বাবু, মৃত মোহাম্মদ হোসেনের কথিত ৯ জন ওয়ারিশসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে করা সিআর মামলার (৬৮৬/২০২৩) তদন্তেও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ তৈরি করে জমির ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পান তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই মেট্রো ইউনিটের উপপরিদর্শক হুমায়ুন কবীর। ১৬ জন বিবাদীর মধ্যে কাউন্সিলর সাহেদ বাবুসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সাবেক এই কাউন্সিলর এখন পলাতক।
এদিকে গত বছরের ২৯ আগস্ট আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয় ‘২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের (সাবেক) কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবু সমস্ত বিষয় অবগত থাকা সত্ত্বেও লোভের বশবতী হয়ে বাদীকে বিপদে ফেলে আর্থিক ক্ষতি করে, অন্যের সম্পত্তি আত্মসাতের অসৎ উদ্দেশে বিবাদীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করেন।’ বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য এল এ মামলা (২৭/২০২০-২১) মূলে কুলগাঁও মৌজার অধীন মোহাম্মদ হোসেনের মালিকানাধীন বিএস ১১৯৮ দাগে ৮ দশমিক ১০ একর ভিটি ভূমি অধিগ্রহণ করে সরকার। জমির ক্ষতিপূরণ এসেছে ২ কোটি ১১ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৬ টাকা।