২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। আজ সেই যুদ্ধের তিন বছর পূর্ণ হলো। দীর্ঘ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে উভয় দেশই। যুদ্ধের বিভীষিকায় বিপর্যস্ত হয়েছে দুই দেশের বেসামরিক নাগরিকরা। তবে মস্কোর সঙ্গে যুদ্ধে লাভের থেকে ক্ষতির সম্মুখীনই বেশি হয়েছে কিয়েভ। বর্তমানে ইউক্রেনের ভূখণ্ডের এক-পঞ্চমাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে মস্কো, প্রধানত দক্ষিণ এবং পূর্বাঞ্চলে। শিল্পসমৃদ্ধ দনবাসের বেশিরভাগ অংশসহ ইউক্রেনের যুদ্ধপূর্ববর্তী মানচিত্রের প্রায় ২০ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রুশ বাহিনী। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই এই যুদ্ধ অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া-ইউক্রেনের শান্তি আলোচনার বিষয়ে তোড়জোড়ও শুরু হয়েছে। যুদ্ধের তিন বছর পূর্তিতে সংঘাতে সাম্প্রতিক চিত্র ও কূটনৈতিক অবস্থা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
দোদুল্যমান ট্রাম্প
সাবেক জো বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সবচেয়ে বেশি সামরিক ও অর্থ সহায়তা দিয়ে এলেও, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান তার বিপরীত মেরুতে। যুক্তরাষ্ট্রের সবশেষ নির্বাচনে জয়ের আগে-পরে সবসময়ই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানের কথা জানিয়ে আসছেন ট্রাম্প। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনাও করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। তাতে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এই আলোচনায় ডাক পায়নি ইউক্রেন কিংবা ইউরোপীয় কোনো দেশ। ইউক্রেনের বিপুল পরিমাণ ভূখণ্ড এরই মধ্যে দখলে নিয়ে নেওয়ায় যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় রাশিয়াই সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাতে ইউক্রেনকে পাশ কাটিয়ে মস্কোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো চুক্তির শঙ্কা করা হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি এই যুদ্ধ বিষয়ে নিজের সুর পাল্টিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিছুদিন আগে যুদ্ধের জন্য সরাসরি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দায়ী করেছিলেন তিনি। তবে সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। পাশাপাশি তিনি বলেন, জেলেনস্কি এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আক্রমণ এড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। ট্রাম্পের এমন দোদুল্যমান অবস্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পের হাতেই ট্রাম্প কার্ড
তিন বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে বেশ তৎপর ট্রাম্প। আর এর পেছনেও রয়েছে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। দীর্ঘ এই সময় ধরে ইউক্রেনকে দিয়ে আসা সহায়তারও ঘোর বিরোধী ট্রাম্প। ফলে কিয়েভকে শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে নানা ধরনের কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। অন্যদিকে ইউক্রেনও জানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া এই যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভবপর হবে না। ফলে এই মুহূর্তে পশ্চিমা সহায়তা বিষয়ে অনেকটাই পশ্চাৎপদ অবস্থায় আছে কিয়েভ। যুদ্ধে নিজেদের সহায়তার বিপরীতে ইউক্রেনের বিপুল খনিজ সম্পদের দাবি করেছেন ট্রাম্প। ইউক্রেনের বিপুল পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও খনিজ, যেমন লিথিয়াম ও টাইটানিয়ামের পাশাপাশি প্রচুর কয়লা, গ্যাস, তেল ও ইউরেনিয়ামের মজুদ রয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি ইউক্রেন।
যুদ্ধকালে সাহায্য হিসেবে ওয়াশিংটনকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ প্রদানের দাবি প্রত্যাখ্যান করে দেশটির প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছিলেন, আমি দেশ বিক্রি করতে দিতে পারি না। তবে সম্প্রতি এক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এক ভিডিও বক্তৃতায় জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা চুক্তির খসড়া তৈরিতে কাজ করছেন। তিনি আশা করছেন, এতে ন্যায্য ফল পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের দেওয়া সহায়তার অর্থ ফেরত নেওয়ার প্রসঙ্গেও কথা বললেন ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শনিবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের বার্ষিক সম্মেলন- কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে এ কথা বলেছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, আমি জেলেনস্কি-পুতিন দুই জনের সঙ্গেই কাজ করছি। ইউক্রেনকে ঋণ হিসেবে অর্থ দিয়েছে ইউরোপ। তারা তাদের অর্থ ফেরত পাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো শর্তে ইউক্রেনকে অর্থ দেয়নি। তবে আমি সহায়তার অর্থ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বহুমুখী চাপের কাছে নত হতে বাধ্য হচ্ছে ইউক্রেন। আর সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে বিরল খনিজ সম্পদের অংশীদারিত্ব দেওয়ার বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করছে কিয়েভ।
ইউরোপীয় নেতাদের ইউক্রেন সফর
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টা উদ্বেগ বাড়িয়েছে ইউরোপীয় নেতাদের। যুদ্ধ বন্ধে ইউরোপ-ইউক্রেনকে পাশ কাটিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে সন্দিহান ইউরোপ। একই সঙ্গে আটলান্টিক অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্পের এমন সব পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ইউরোপীয় নেতারা। তার ধারাবাহিকতায় আজ ইউক্রেনে মিলিত হয়েছেন ইউরোপের শীর্ষ নেতারা। মূলত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পাশে দাঁড়াতে এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা করতে ইউক্রেন সফর করছেন তারা। ইউরোপের শীর্ষ নেতাদের এই দলে আছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়ন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সভাপতি রবার্টা মেটসোলা। এ ছাড়া লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, মাল্টা এবং কানাডার নেতাদের সরাসরি বা ভার্চুয়ালি জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তার কারণে সব অংশগ্রহণকারী নেতাদের নাম প্রকাশ করতে পারছেন না তার।
আবারও বৈঠকে বসবে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র
রাশিয়ার সঙ্গে ফের বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বিতীয় বৈঠকটি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আরআইএ। সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরবর্তী বৈঠকটি তৃতীয় কোনো দেশে অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণে একমত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে তিনি রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বৈঠকে কারা যোগ দেবেন সে সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। তিনি বলেন, আমরা এখন দুটি সমান্তরাল পথে আছি। তবে অতীতের তিক্ততা ভুলে বর্তমানে কিছুটা হলেও রাজনৈতিকভাবে আন্তঃসংযুক্ত পথের মুখোমুখি হয়েছি। এর একটি হলো ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যটি দ্বিপাক্ষিক। রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যখন আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে উন্নতির জন্য দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাই, তখন কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সংলাপের সম্ভাবনা তৈরি হয়। যা উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক। আসন্ন এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্য নিয়েও আলোচনা করতে পারে বলে জানান তিনি।
হোয়াইট হাউজের প্রত্যাশা
চলতি সপ্তাহে তিন বছর ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের ঘোষণা আসতে পারে বলে আশা করছে হোয়াইট হাউজ। স্থানীয় সময় শনিবার এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট। তিনি বলেন, এই সংঘাত বন্ধে চলতি সপ্তাহের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট এবং তার দল এই যুদ্ধের উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার দিকে বেশ মনোযোগী। সেই সঙ্গে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও ইউক্রেনের সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়ে একটি প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছেন বলেও জানান লেভিট।
ইউক্রেনে রুশ হামলা
যুদ্ধের তিন বছর পূর্তির প্রাক্কালে ইউক্রেনে এক রাতেই আড়াই শতাধিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। তিন বছর আগে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক দিনে এটাই সর্বোচ্চ ড্রোন হামলার ঘটনা। রবিবার ইউক্রেনের বিমান বাহিনী এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। বিমান বাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইগনাট বলেছেন, সমন্বিত এক হামলায় রেকর্ডসংখ্যক ২৬৭টি রুশ ড্রোন উৎক্ষেপণ করেছে মস্কো। সিরিজ এই ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ ও অগ্নিকাণ্ডের কথা জানিয়েছে দেশটির জরুরি পরিষেবা সংস্থাগুলো। বলছে, ব্যাপক ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে ও ভবনে আগুন লেগেছে। তবে হামলায় কতজন নিহত হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। রাশিয়ার হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক বিবৃতিতে বলেন, পূর্ণ-পরিসরে যুদ্ধের তৃতীয় বার্ষিকীর প্রাক্কালে, রাশিয়া ইউক্রেনের শহর ও গ্রামগুলোতে ইরানি ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাশিয়া এই সপ্তাহে মোট ১,১৫০টি আক্রমণাত্মক ড্রোন, ১,৪০০টিরও বেশি গাইডেড বোমা ও বিভিন্ন ধরনের ৩৫টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে।