টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে তেমন কিছু নেই

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন,  দেশের অর্থনীতির সমস্যা কী, সে বিষয়ে আমরা সবাই কমবেশি অবগত। অনেক দিন ধরেই এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি নিজে অন্তত এক হাজার অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেছি। কিন্তু কেন সমস্যার সমাধান হয় না বা কোথায় গিয়ে সব আটকে যায়, তার ব্যাখ্যা দরকার। টাস্কফোর্সের কাছে তার প্রত্যাশা ছিল, সংস্কার কেন আটকে যায়, তার ব্যাখ্যা থাকবে। কিন্তু টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে তেমন কিছু নেই। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল সোমবার ‘রিকমেন্ডেশনস বাই দ্য টাস্কফোর্স অন রিস্ট্র্যাটেজাইজিং দ্য ইকোনমি’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। অধিবেশনটিতে সভাপতিত্ব করেন অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণে গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান কে এ এস মুরশিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টাস্কফোর্সের সদস্য অধ্যাপক সেলিম রায়হান ও অধ্যাপক এমএ রাজ্জাক।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বাজারকে উপেক্ষা করা উচিত নয় উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, আপনি যদি চীনের মতো দেশগুলো দেখেন, চীন মূলত তার শিল্পায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছিল কারণ তাদের এক বিলিয়নের বেশি মানুষের একটি অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল। চীনে আসা এফডিআইয়ের প্রধান আকর্ষণ ছিল এই বিরতি বাজারে প্রবেশ করা।

রেহমান সোবহান বলেন, অটোমোবাইল নির্মাতাদের সবাই চীনে এসেছিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে চীনকে অটোমোবাইলের বৃহত্তম প্রস্তুতকারক বানিয়েছিল। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রধান আকর্ষণ ছিল। ইলেকট্রনিক গাড়ির ক্ষেত্রে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রপ্তানিকারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সিপিডি চেয়ারম্যান বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে গত ৩০ বছরে যে বিষয়গুলো বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, এখনো তার সমাধান হয়নি। যতক্ষণ না আপনি সঠিকভাবে এটি নির্ণয় করতে পারবেন, ততক্ষণ আপনি ভবিষ্যতের জন্য সত্যিকারের নীতি সংস্কারের পরামর্শ দিতে পারবেন না।

অনুষ্ঠানে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, গত সরকারের আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। ওই সময় বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, একসময় যেভাবে তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ হয়েছিল, এখন সেভাবে তা হবে না। সে কারণে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানি সম্প্রসারণে জোর দেন।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন টাস্কফোর্সের দুই সদস্য গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান ও র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক।

সেলিম রায়হান বলেন, তৈরি পোশাক খাতেরও সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। দেশে যে পোশাক তৈরি হয়, তা মূলত তুলাভিত্তিক; যদিও বিদেশে কৃত্রিম সুতাভিত্তিক পোশাকের বাজার আছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতকে যে ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, অন্য খাতেও সে ধরনের সুযোগ দেওয়া হোক।

এমএ রাজ্জাক বলেন, দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। এটির বাজারও নির্ধারিত। মূলত ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি হয় বেশি। কিন্তু ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করে গেলে তখন এ বাজারে সাড়ে ১১ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন রপ্তানির বাজারে প্রবেশ করার উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তা ছাড়া আগামী দিনে রপ্তানি করতে হলে সব ধরনের কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তারাই ছিল অর্থনীতির নিয়ন্তা। সরকারের বলয়ের বাইরে কাউকে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারণ করতে হলে নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রমের বাড়াবাড়ি হ্রাস করতে হবে বলে তিনি মত দেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশিদের যে উদ্বেগ রয়েছে, সেগুলো দূরীকরণে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি নিয়ে কাজ করার জন্য স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর জোর দেন বিএনপির এ নেতা।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইউনিলিভারের চেয়ারম্যান ও এমডি জাভেদ আখতার।