পদোন্নতি না হলে রোগী দেখা বন্ধের হুঁশিয়ারি

আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পদোন্নতি দেওয়া না হলে আগামী মাসে সারা দেশে কলমবিরতি কর্মসূচি পালন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডিরেক্টর কনফারেন্স কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেয় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফোরাম।

সংবাদ সম্মেলনে পদোন্নতিযোগ্য সব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সুপারনিউমারারি বা সংখ্যাতিরিক্ত হিসেবে পদোন্নতি দাবি করে সংগঠনের সদস্য সচিব ডা. মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে দাবি আদায় না হলে প্রথমে তিন দিন দুই ঘণ্টা করে এবং পরে টানা কলমবিরতিতে যাওয়া হবে। অর্থাৎ তখন কোনো রোগী দেখা হবে না। শুধু জরুরি সেবা দেওয়া হবে।

এ চিকিৎসক নেতা বলেন, আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যে পদোন্নতি চাচ্ছি সেখানে অর্থনৈতিক বা বেতন বৃদ্ধির বিষয় নেই। এটা শুধু পদোন্নতির জন্য।

মিথ্যা আশ্বাসে পদোন্নতি আটকে রাখা হচ্ছে এমন অভিযোগ করে সংগঠনের আরেক নেতা ডা. বশির আহম্মেদ খান বলেন, এখন আমাদের এক দফা এক দাবি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পদোন্নতির যোগ্য সব বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে পদোন্নতি দিতে হবে। তা না হলে আগামী ৫ মার্চ থেকে সারা দেশের প্রতিটি হাসপাতালে সব বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কলমবিরতি পালন করব। এরপর ১১ মার্চ থেকে পূর্ণাঙ্গ কলম বিরতি কর্মসূচি পালন করব। এর জন্য দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যদি কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তাহলে তার দায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে।

ডা. মোহাম্মদ আল আমিন জানান, বিসিএস স্বাস্থ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চাকরির নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর পদোন্নতি দেওয়া হয় কাজের মান ও গতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য। বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস এবং ফাউন্ডেশন ট্রেনিং সম্পন্ন করা থাকলে চাকরি স্থায়ী হয়। চাকরি স্থায়ী এবং চাকরির চার বছর হলে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা দেওয়া যায়। এরপর উত্তীর্ণরা পদোন্নতির যোগ্য হন। কিন্তু এখন স্বাস্থ্য ক্যাডারের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (এফসিপিএস/এমডি/ডিপ্লোমা) লাগে, যা মোটেও কোনো সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়। বর্তমান পদোন্নতি জটে আটকে পড়ে আছে যোগ্য চিকিৎসকরা। যেসব চিকিৎসক প্রমোশন যোগ্য হয়ে দীর্ঘদিন বসে আছেন তাদের ন্যায্য প্রমোশন হলে বেতন স্কেলের কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না এবং পদোন্নতিতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে না। কেননা এদের বেশিরভাগই নিজ নিজ গ্রেড/সমমান ও তদূর্ধ্ব বেতনপ্রাপ্ত।

স্বাস্থ্য ক্যাডারে অবহেলা ও সংকটের সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরে সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. মুস্তাব মৌসুমী বলেন, দশ বছর আগে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শেষ করেও এখন আমি একটি উপজেলা হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে আছি। যেমন কোনো সাবজেক্টে সরাসরি সহকারী অধ্যাপক আবার কোনো সাবজেক্টে আরপি/আরএস থেকে জুনিয়র কনসালট্যান্ট সহকারী অধ্যাপক নেওয়া হয়। এর ফলে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য তৈরি হয়। কোনো সাবজেক্টে আবার ষষ্ঠ গ্রেডের তেমন পদই নেই, যেমন ডেন্টাল। কিছু বিশেষ ক্যাডারের চাকরিতে নির্দিষ্ট সময়ের পর দ্বিতীয় ও প্রথম গ্রেডপ্রাপ্ত হয়, কিন্তু স্বাস্থ্য ক্যাডারকে কোনো কারণ ছাড়াই এটা থেকে বঞ্চিত করা হয়, এর উত্তর আমরা চাই।

এই বৈষম্য তৈরি হওয়ার কারণ তুলে ধরে এ চিকিৎসক বলেন, প্রতি বছর পুরনো ও নতুন মেডিকেল কলেজগুলোতে মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। পুরনোগুলোয় ২৫০ এবং নতুনগুলোতে ৭৫ হাজার ১০০ জন শিক্ষার্থী প্রতি বছর ভর্তি হচ্ছে। তবে সে অনুপাতে পদ সৃষ্টি না হওয়ায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মাঝের ব্যবধান অনেক বেড়ে গেছে।

মেডিকেল কলেজগুলোর পদ তৈরির পাশাপাশি পদোন্নতি জরুরি বলে মন্তব্য করেন ডা. বশির আহম্মেদ খান। তিনি বলেন, অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন, যাদের পদোন্নতি না হওয়ায় তাদের নিজস্ব বিষয় বাদ দিয়ে অন্য সেক্টরে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এটাতে যেমন মেধার অপচয় হচ্ছে, তেমনি ওই নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রকৃত সেবা থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। এই বৈষম্য কমাতে পদোন্নতিবঞ্চিত চিকিৎসকদের ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের আহ্বায়ক ডা. মির্জা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, যোগ্য সব বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দ্রুত সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দিতে হবে।

আরও ৪৮ ঘণ্টা কর্মবিরতির ঘোষণা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের : মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের চিকিৎসক পদবিসংক্রান্ত রিট দ্রুত নিষ্পত্তি, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) এবং ডিপ্লোমা অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি ইন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাতিলসহ পাঁচ দফা দাবিতে আরও ৪৮ ঘণ্টা কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। আজ বুধবার থেকে তারা এ কর্মবিরতি পালন করবেন। এ ছাড়া আজ বেলা ১১টায় তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন।

গতকাল আন্দোলনরত চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিস’-এর পক্ষ থেকে সংগঠনের সভাপতি ডা. জাবির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ডা. নুরুন নবী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডাক্তার পদবি ব্যবহারসংক্রান্ত রিটের রায়ের তারিখ ঘোষণা করেছে আদালত। আগামী ১২ মার্চ এ রিটের রায় ঘোষণা করা হবে। আমরা আমাদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে একটি দাবির দিকে কিছুটা অগ্রসর হতে পেরেছি। তবে যাত্রা এখানেই থেমে থাকবে না। বাকি দফাগুলো নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আগামীকাল দাবি আদায়ে বসব। আগামী ৪৮ ঘণ্টা সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল এবং ডেন্টাল কলেজের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং ইন্টার্নদের কর্মবিরতি চলমান থাকবে।

নতুন কর্মসূচি প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে, আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে সব চিকিৎসক এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বা কার্যকরী পদক্ষেপ না দেখলে ৪৮ ঘণ্টা পর থেকে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

জানা গেছে, গত শনিবার থেকে টানা ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন। গতকাল কয়েকশ ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থী রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে হাইকোর্ট অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সুপ্রিম কোর্টের ফটকে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। পরে আন্দোলনরত চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। কর্মবিরতি চলাকালে তারা ‘অ্যাকাডেমিক শাটডাউন’ পালন করবেন, অর্থাৎ এ সময়ে তারা কোনো অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেবেন না।

আন্দোলনকারীরা জানান, ২০১৩ সালে মেডিকেল সহকারীরা ডাক্তার উপাধি ব্যবহারের অধিকার চেয়ে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। তাদের অভিযোগ, ১১ বছর ধরে মামলাটি বিচারাধীন থাকায় আইনি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মেডিকেল সহকারীরা অবৈধভাবে এই উপাধি ব্যবহার করছেন।