শিল্পে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবকে ‘বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে সিস্টেম লসের নামে যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস চুরি হয়, তা বন্ধের দাবি জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষ।
মূল্যবৃদ্ধির তীব্র বিরোধিতা করে অংশীজনরা বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ালে হুমকির মুখে পড়বে বিনিয়োগ-ব্যবসা-বাণিজ্য আর শিল্প খাত। যার ফলে সার্বিকভাবে ব্যাহত হবে দেশের অর্থনীতি। গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আগামী রবিবারের মধ্যে খারিজ না করলে দুর্বার আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আমলে নিয়ে গতকাল বুধবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) । সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এই শুনানির বিরোধিতা করেন।
শুনানি চলাকালে তা বাতিল দাবিতে একই ভবনের নিচে মানববন্ধন করেছে ক্যাব। একই সঙ্গে এ ধরনের পদক্ষেপকে প্রহসন দাবি করে শুনানি বয়কট করেন তারা।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শুনানিতে ক্যাব, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
শুনানির প্রথমপর্বেই তুমুল বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শিল্প খাতে গ্যাসের দাম ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ দশমিক ৭২ টাকা করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে প্রতিবাদকারীদের একটি দল এই শুনানি অবিলম্বে বাতিলের দাবি তোলে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের বক্তব্যের পরপরই প্রতিবাদকারীরা স্লোগান দিতে শুরু করেন এবং প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
‘প্রহসনের এই শুনানি বন্ধ করো, এখনই বন্ধ করো’ এমন স্লোগান দিতে থাকেন প্রতিবাদকারীরা। একপর্যায়ে ক্যাবের নেতারা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবকে ‘বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দিয়ে শুনানি থেকে ওয়াকআউট (ত্যাগ) করেন।
বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নির্ধারিত সময়ের আগেই মধ্যাহ্নবিরতির ঘোষণা দেন।
এর আগে শুনানিতে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, বিইআরসি আসলে সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়ন করছে। কমিশনের উচিত স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সরকারের চাপে নতি স্বীকার না করা।
তিনি সতর্ক করে বলেন, গ্যাসের দাম ৩০ টাকা থেকে ৭৫ দশমিক ৭২ টাকা হলে শুধু জ্বালানি খাত নয়, সব উৎপাদন খাত ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। সরকারকে উদ্দেশ করে শামসুল
আলম বলেন, ‘আপনারা যদি এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন এবং এর কারণ অনুধাবন করতে না পারেন, তবে আমাদের শিল্পখাত বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাবে।’
কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স ওই শুনানির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘বিইআরসি কি কখনো গবেষণা করেছে, এই বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি দেশের ব্যবসা খাতের ওপর কী প্রভাব ফেলবে? ’
গ্যাসের দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে জানানো হয়, গ্যাসের দাম বাড়ানো না হলে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে চলতি বছর সরকারকে বিশাল টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে আসছে অর্ধেকের মতো। আর ২৫ শতাংশ এলএনজি আমদানি করে জোগান দেওয়া হচ্ছে।
গণশুনানিতে পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতি ঘনমিটার এলএনজির বর্তমান আমদানি মূল্য পড়ছে ৬৫ টাকা ৭০ পয়সা। ভ্যাট-ট্যাক্স ও অন্যান্য চার্জ যোগ করলে তা দাঁড়ায় ৭৫ টাকা ৭২ পয়সা। এ জন্য দামের পার্থক্য কমাতে গ্যাসের মূল্য বাড়াতে হবে।
শুনানি চলাকালে ক্যাবের মানববন্ধন : গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বিয়াম ভবনে শুনানি চলাকালে একই ভবনের নিচে ওই শুনানি বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ক্যাব। এর আগে ২২ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে ওই শুনানি স্থগিত করার দাবি জানিয়েছিল সংগঠনটি। তবে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের শুনানি শুরু হয়।
গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে ক্যাবের মানববন্ধনে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, ‘এক লাফে তিন গুণ দাম বৃদ্ধি হলে নতুন কোনো শিল্প হবে না। সরকারকে প্রয়োজনে এখন ভর্তুকি দিতে হবে, দাম বাড়ানো যাবে না।’
২২ ফেব্রুয়ারির সংবাদ সম্মেলনে ক্যাবের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিইআরসি গত ১৫ বছর শুধু মূল্যহার নির্ধারণের কাজ করেছে।
১৩ ফেব্রুয়ারি বিইআরসিতে চিঠি দিয়েছিল ক্যাব। তাতে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি, এলপিজি, সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ সরবরাহে অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় কতটা সমন্বয় হয়েছে, তার পরিমাণ বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত হতে হবে। লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফা রোধ করে এবং সরকারের রাজস্ব কমিয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানির মূল্যহার এবং ভর্তুকি কী পরিমাণ কমানো সম্ভব, তা বিইআরসির হিসাব করতে হবে। জ্বালানি-সংক্রান্ত অপরাধীদের বিচারের জন্য বিইআরসি আইনের আওতায় ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।
গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব অযৌক্তিক-অবাস্তব : নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘শিল্পে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের। আবার যতটুকু পাওয়া যায়, তাও সঠিক চাপে পাওয়া যায়না। তিতাসের রিপোর্টে দেখেছি, ৪০ শতাংশ সিস্টেম লস, মানে চুরি। গ্যাসের চুরির কারণে বাকি চাপ আমাদের ওপর আসে। এখন উনারা (তিতাস) বলছে, ৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নারায়ণগঞ্জে হাজার হাজার গ্যাসের অবৈধ চুলা রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে তিতাস জড়িত। সিস্টেম লস কমালে মূল্যবৃদ্ধির চিন্তা করতে হতো না। এখনো তিতাসের হিসাবে ১৩ শতাংশ সিস্টেম লস। ১ শতাংশ সিস্টেম লস কমালে এক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়।
গ্যাসের দাম এক টাকা বাড়ানোরও যুক্তি নেই : শুনানিতে অংশ নিয়ে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। গ্যাসের দাম ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা করাতো দূরের কথা এক টাকা বাড়ানোরও কোনো যুক্তি নেই।
‘গ্যাসের সিস্টেম লস মানে চুরি, আসল সিস্টেম লস তো অল্প। সরকারের কাছে দাবি জানাই, চোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এনার্জি সেক্টরে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে,’ যোগ করেন সাকি।
গণশুনানিতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিইআরসি সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) মো. আব্দুর রাজ্জাক, সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান, সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার প্রমুখ।