দৃষ্টিহীন মানুষ যেন পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়, তারাও যেন সবার সঙ্গে তাদের পড়ার কাজ চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছে ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা’। দৃষ্টিহীনদের জন্য বই পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করাই এই প্রকাশনার প্রধান লক্ষ্য। অন্য প্রকাশনীগুলো যেখানে বই বিক্রির উদ্দেশ্যে মেলায় অংশ নেয়, সেখানে স্পর্শ ব্রেইল মেলায় এসেছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পড়ার সুযোগ করে দিতে।
প্রকাশনাটির স্টলে গিয়ে দেখা যায়, কেউ স্পর্শের মাধ্যমে ব্রেইল বই পড়ছেন, কেউ শুনছেন অন্য কারও কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দ, আবার কেউ আগ্রহী হয়ে ব্রেইল পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইছেন। স্টলের কর্মীরা ধৈর্যসহকারে সবার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং ব্রেইল বই সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন।
প্রকাশনী সম্পর্কে জানা যায়, স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা ২০১১ সাল থেকে ব্রেইল পদ্ধতিতে বই প্রকাশ করে আসছে। এ পর্যন্ত তারা ১৬৬টি বই প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে এ বছর নতুন ৮টি বই যুক্ত হয়েছে। ঈদের পর আরও দুটি বই আসার কথা রয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি এই ৮টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এদিন প্রায় ১২০ জন দৃষ্টিজয়ীকে একসেট স্পর্শ ব্রেইলের বই বিতরণ করা হয়।
স্টলের স্বেচ্ছাসেবক সাইফুদ্দিন রাফি জানান, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো দৃষ্টিহীনদের কাছে সাহিত্য পৌঁছে দেওয়া। তিনি বলেন, বইমেলায় আমাদের স্টলেই একমাত্র ব্রেইল বই পাওয়া যায়। আমরা চাই, বইমেলার প্রতিটি প্রকাশনী অন্তত কিছু বই ব্রেইলে প্রকাশ করুক, যাতে দৃষ্টিহীনরা সাহিত্য থেকে বঞ্চিত না হয়।
স্পর্শ ব্রেইলের প্রতিনিধি ঊষা জানান, তারা কোনো বই বিক্রি করেন না; বরং বইমেলায় আগত দৃষ্টিহীনদের পড়ার সুযোগ করে দেন। বই প্রকাশের সময় যেসব দৃষ্টিজয়ী নিবন্ধন করেন, তাদের মধ্যেই বিনা মূল্যে বই বিতরণ করা হয়।
তিনি বলেন, এ বছর আমরা রহমত ও বারাকা, সমন্বিত যৌন শিক্ষা, স্পর্শ ছুড়ি, দাঁতের যতœ, আনা ফ্র্যাঙ্কের ডায়েরি, তিব্বতের লৌককাহিনীসহ ৮টি নতুন ব্রেইল বই প্রকাশ করেছি।
ব্রেইল বইয়ের লেখা ও পড়ার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি ছয় ডটের বিশেষ কোডের মাধ্যমে লেখা হয়। দৃষ্টিহীনদের এই কোড শিখতে হয়, তারপর তারা আঙুলের স্পর্শে বুঝতে পারে কী লেখা আছে। কেউ কেউ এক সপ্তাহের মধ্যেই শিখে ফেলে, আবার কারও সময় লাগে কয়েক মাস বা তারও বেশি।
ব্রেইল বই তৈরির ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক তরিকুল ইসলাম বলেন, ব্রেইল বইয়ের জন্য বিশেষ ধরনের কাগজ ও প্রিন্টার প্রয়োজন, যা সাধারণ বইয়ের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল। প্রতিটি পৃষ্ঠার কাগজ ৪-৫ টাকা দামে কেনা হয়, আর প্রিন্টিং খরচ যুক্ত হলে পুরো বইটি তৈরি করতে বড় অঙ্কের ব্যয় হয়।
দৃষ্টিজয়ী শিক্ষার্থী মহিনি আক্তার তামিম বলেন, স্পর্শ ব্রেইল আমাদের জন্য যে সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এখানে এসে আমি চাঁদের পাহাড়, একাত্তরের চিঠি, আমার বন্ধু রাশেদসহ অনেক বই পড়েছি। স্পর্শের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
গতকাল বুধবার বইমেলায় মোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৬৬টি। বুধবার পর্যন্ত ২৬ দিনে মেলায় আসা নতুন বইয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৮৮৩টি।
আজকের অনুষ্ঠান : আজ বৃহস্পতিবার। অমর একুশে বইমেলার ২৭তম দিন। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে কাজী মারুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশ বিনির্মাণ : রাষ্ট্র কাঠামো’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রেজাউল করিম রনি। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন সৈয়দ নিজার।