চলমান চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সবচেয়ে ভয়ংকর স্পিনার কে? রশিদ খান? কুলদীপ যাদব? না কি মিচেল স্যান্টনার? না, কেউই নন! অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সেটা দখল করেছেন নিউজিল্যান্ডের অফস্পিনার অলরাউন্ডার মাইকেল ব্রেসওয়েল। ছয় বছর আগেও নিয়মিত অফস্পিনার ছিলেন না। এখন তিনিই চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সবচেয়ে কৃপণ স্পিনার, সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিও। ব্রেসওয়েলের গল্পটা ঠিক এমনই চমকপ্রদ।
ব্রেসওয়েল এখন পর্যন্ত স্পিনারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী, সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলারও। দুই ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়া ব্রেসওয়েলের গড় মাত্র ১২.৮০, ইকোনমি রেট ৩.২০। বাংলাদেশের বিপক্ষে তার ক্যারিয়ারসেরা ৪/২৬ পারফরম্যান্স নিউজিল্যান্ডকে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, তার ১২০ বলের মধ্যে ৮৫টি ছিল ডট বল!
করাচি ও রাওয়ালপিন্ডির উইকেটে যখন খুব বেশি টার্ন পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন ব্রেসওয়েল কাজে লাগান নিজের বিশেষত্ব—ড্রিফট। বাতাসে বল ভাসিয়ে ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত করার কৌশল, যা তিনি নিয়মিত করে থাকেন তার হোম গ্রাউন্ড ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভে। উইকেট যত পুরোনো হয়েছে, পিচ যত মন্থর হয়েছে, ব্রেসওয়েল ততই তার গতি কমিয়ে বলের গ্রিপ ও টার্ন বাড়িয়েছেন। আর এ কাজটা করেছেন এত নিখুঁতভাবে যে, স্টাম্পের সামনে থেকেই বিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের ফাঁদে ফেলার কাজটা সহজ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ব্রেসওয়েল বলেন,‘এসব উইকেটে আপনাকে গতি পরিবর্তন করতে হবে, কারণ এখানে স্পিনারদের জন্য খুব বেশি সহায়তা থাকে না। আমাদের বোলিং ইউনিটের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা হলো, গতি বৈচিত্র্য আনা। নিউজিল্যান্ডের উইকেটও বেশ ফ্ল্যাট, সেখানে বেশি টার্ন পাওয়া যায় না। ফলে আপনাকে বাতাসে বল ঘোরানোর চেষ্টা করতে হয়, যা আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিখে আসছি।’
নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার তো এমনকি নিজের চেয়ে ব্রেসওয়েলকে আগে বোলিং করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে। এমনকি বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্রেসওয়েল টানা ১০ ওভারের একটানা স্পেল করেছেন, যা তার নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীলতার প্রমাণ।
অবাক করা ব্যাপার হলো, ব্রেসওয়েল মাত্র ছয় বছর আগে পুরোদস্তুর অফস্পিন শুরু করেন! ২০১৭ সালে ওটাগো ছেড়ে ওয়েলিংটনে আসেন তিনি। তখনও মূলত ব্যাটসম্যান ও ব্যাকআপ উইকেটকিপার ছিলেন। নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে চেয়েছিলেন, তাই ২০১৯ সালে স্পিনার হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। ওয়েলিংটনের কিংবদন্তি স্পিনার জিতেন প্যাটেল অবসর নেওয়ার পর, তার শূন্যস্থান পূরণে ব্রেসওয়েল নিজেকে তৈরি করেন স্পিন-বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে।
ওয়েলিংটনের স্পিন কোচ ল্যান্স ড্রাই বলেন, ‘মাইকেলের গল্পটা সত্যিই অনন্য। আমি তখন তার ক্লাবের অধিনায়ক ছিলাম, তখনই আমরা তাকে ক্লাব ক্রিকেটে অফস্পিনার হিসেবে পরিচিত করতে শুরু করি। এরপর ধাপে ধাপে সে উন্নতি করতে থাকে। হেনরি নিকোলসকে দুই ইনিংসে আউট করার পর, কয়েক ম্যাচ পরেই সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ফাইফর নেয়। তখনই বোঝা যায়, সে লম্বা সময়ের জন্য দলে টিকে থাকতে পারে। প্যাটেল অবসর নেওয়ার পর, আমাদের কোনো অফস্পিনার ছিল না। তখনই মাইকেল তিন ফরম্যাটেই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে ওঠে।’
ব্রেসওয়েল স্বাভাবিকভাবেই শারীরিকভাবে শক্তিশালী—লম্বা গড়ন, বড় হাত, যা তাকে বলের গ্রিপে বাড়তি সুবিধা দেয়। তবে তার সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা। ড্রাই বলেন, ‘মাইকেল খুবই পরিশ্রমী এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। অনেক গ্রীষ্মকাল আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি, যেখানে প্রতি তিন-চার মাস ধরে একটি নির্দিষ্ট টেকনিক নিয়ে কাজ করতাম। একটা সময় সে তার সামনের হাঁটু আরও উঁচুতে তুলতে চেয়েছিল, যেন ডেলিভারির সময় শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখা যায়। এই ছোটখাট পরিবর্তন আনতে সে দীর্ঘ সময় অনুশীলন করেছে।’
ড্রিফট ব্যবহারেও তিনি বেশ দক্ষ। ড্রাই বলেন, ‘ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভে বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ব্রেসওয়েলের বড় শক্তি। সে প্রচুর স্পিন প্রয়োগ করে, এবং হাতের অবস্থান পরিবর্তন করে ড্রিফটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এসবই তার স্কিলের গভীরতা প্রমাণ করে।’
ব্রেসওয়েল যখন দুবাইয়ে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবেন, তখন সেখানে ড্রিফট তেমন কাজে আসবে না। ভারতের ব্যাটসম্যানরা স্পিন খেলার নানা কৌশলে পারদর্শী, পিচের নিচে গিয়ে খেলতে পারে, সুইপ-রিভার্স সুইপ ভালোই জানে। তবে ব্রেসওয়েল নিজেই একজন ভালো ব্যাটসম্যান হওয়ায়, বোলার হিসেবে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের মানসিকতা বোঝার সুবিধা পান।
ড্রাই বলেন, ‘মাইকেল জানে একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে সে কী কী পছন্দ করে না। এতে তাকে কৌশল সাজাতে সুবিধা হয়। বিশেষ করে, সে নিজেও আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান, তাই আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যানদের নিয়ন্ত্রণ করা তার পক্ষে সহজ।’
২০২৩ বিশ্বকাপে তিনি ভারতের বিপক্ষে ৭৮ বলে ১৪০ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছিলেন, প্রায় অসম্ভব রান তাড়া করতে গিয়ে একাই লড়েছিলেন। এবার সেই ভারতকেই মোকাবিলা করতে হবে তাকে দুবাইতে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অফস্পিনের দিন ভালো যাচ্ছে না, কারণ ব্যাটসম্যানরা এই ধরণের বোলিংকে বিশেষভাবে টার্গেট করে। কিন্তু ব্রেসওয়েল এই প্রতিকূলতার মধ্যেও নজর কাড়ছেন। তার ওয়ানডে ইকোনমি রেট ৪.৮৪, টি-টোয়েন্টিতে ৬.৯৩।
ড্রাই বলেন, ‘মাইকেলের পরিসংখ্যান অসাধারণ। ধরুন, আমরা যদি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের সঙ্গে তুলনা করি, ওয়ানডেতে তার বোলিং গড় অশ্বিনের চেয়েও ভালো, টি-টোয়েন্টিতে প্রায় সমান, আর ইকোনমি একটু ভালো। সে ওয়ানডেতে পাঁচের নিচে রান দিচ্ছে, টি-টোয়েন্টিতে সাতের নিচে। যদিও বয়স কম নয়, তবে বোলার হিসেবে তার সামনে আরও অনেক ভালো বছর অপেক্ষা করছে।’
চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ব্রেসওয়েলের উত্থান নীরব, কিন্তু তার প্রভাব বিশাল। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচেই বোঝা যাবে, এই 'ডট-বল বিস্ট' কোথায় গিয়ে থামবেন!