ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নতুন প্রচেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনায় ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ও শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ইউক্রেনকে সবচেয়ে বেশি সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে চিত্র। পূর্বের সে অবস্থান থেকে সরে এসে পুরোপুরিভাবে কিয়েভের হাত ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে ইউক্রেনে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে তৎপর হয়েছে ইউরোপ। রবিবার লন্ডনে এক জরুরি সম্মেলন শেষে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করতে পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন ইউরোপের নেতারা। ইউক্রেনের সঙ্গে কাজ করতে চার দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলোর মধ্যে ছিল ফ্রান্স, পোল্যান্ড, সুইডেন, তুরস্ক, নরওয়ে, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া, ফিনল্যান্ড, ইতালি, স্পেন ও কানাডা।

‘সিকিউর আওয়ার ফিউচার’ শীর্ষক এই সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তার আমন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ছিলেন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ নেতারাও। সেখানে আলোচনা শেষে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে চার দফা পরিকল্পনার বিষয়ে ইউরোপের দেশগুলোর ঐকমত্যের কথা জানান কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধে একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে ইউক্রেনের সঙ্গে কাজ করতে একমত হয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অন্য ইউরোপীয় দেশ। এই পরিকল্পনা নিয়ে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আজ ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এটা কথা বলার কোনোও সময় নয়। স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সবাই ঐক্যবদ্ধ ও একসঙ্গে কাজ করার এবং পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এটা। ইতিহাস আমাদের একটা কথা বলে, ইউরোপের কোথাও যদি সংঘাত চলতে থাকে, তা একদিন সবার দুয়ারে ধাক্কা দেবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, কিয়েভ শক্তিশালী সমর্থন অনুভব করছে। এই সম্মেলন ইউরোপীয় ঐক্যের এক অনন্য উচ্চতা প্রদর্শন করেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই ইউরোপে একসঙ্গে কাজ করছি, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি ভিত্তিস্থাপন করা যায়। এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন মাত্র দুই দিন আগে হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে।

চার দফা পরিকল্পনা : ইউরোপের শীর্ষ নেতাদের এই সম্মেলন শেষে স্টারমার চার দফা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো : যুদ্ধ চলাকালে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো। স্থায়ী শান্তির ক্ষেত্রে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং যেকোনো শান্তি আলোচনায় ইউক্রেনকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ ঠেকানোর লক্ষ্যে কাজ করতে হবে ইউরোপের নেতাদের। ইউক্রেনের সুরক্ষার জন্য একটি জোট গঠন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিরোধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তবে কোন কোন দেশ এই জোটে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে তা জানাননি স্টারমার। যে দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পনা এগিয়ে নেবে বলে জানান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইউক্রেনকে ১৬০ কোটি পাউন্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কিয়ার স্টারমার। এই অর্থ খরচ করে ইউক্রেনের জন্য পাঁচ হাজারের বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেনা হবে।

এই সংকট সমাধানে ইউরোপকে অবশ্যই বড় দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন স্টারমার। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মাঠে সেনা ও আকাশে বিমান মোতায়েন করতে প্রস্তুত। আমাদের এই মহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ ও তা সফল হওয়ার জন্য অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সমর্থন থাকতে হবে। আলোচনায় রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। তবে মস্কোকে কোনো শর্ত নির্ধারণ করতে দেওয়া যাবে না। স্টারমার বলেন, টেকসই শান্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমরা ট্রাম্পের সঙ্গে একমত। এখন আমাদের একসঙ্গে এটির বাস্তবায়ন করতে হবে। সম্মেলন শেষে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ শেষে ইউক্রেনে যেন একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকে সেটা নিশ্চিত করা পশ্চিমা মিত্রদেশগুলোর মূল লক্ষ্য।

ইউরোপের প্রতিরক্ষা : লন্ডনের এই সম্মলনে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধানদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এই আলোচনাকে ফলপ্রসূ আখ্যা দিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেন, আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সত্যিকার অর্থে আমাদের বিশাল পরিসরে অগ্রসর হতে হবে। তিনি আরও বলেন, এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো। সবচেয়ে খারাপ কিছুর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইউরোপকে এখন পুনরায় সশস্ত্র করা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে বার্তায় তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আমরা আপনার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছি। তবে এই নীতি বজায় রাখার জন্য আপনি আপনার প্রতিবেশী দেশে আক্রমণ করতে পারবেন না বা শক্তি প্রয়োগ করে সীমান্ত পাল্টে ফেলতে পারবেন না। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট্টেও সম্মেলনের পর একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে দীর্ঘ মেয়াদে লড়াই চালিয়ে যেতে যা কিছু দরকার তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে ন্যাটো।