দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর কংগ্রেসে প্রথমবার ভাষণ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবারের কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দেওয়া এই ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রে পুনরুত্থানের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আবার বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে আনবেন বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ভাষণের শুরুতে ট্রাম্পকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানান রিপাবলিকানরা। তাদের অভিবাদনের জবাব দিয়ে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, দেশের নাগরিকদের বলছি, আমেরিকা তার গৌরব ফিরে পেয়েছে। আমরা এমন এক প্রত্যাবর্তন করতে যাচ্ছি, যা বিশ্ববাসী কোনো দিন দেখেনি এবং ভবিষ্যতেও হয়তো দেখবে না। গত ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে অভিষেক হয় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। এরপর তার নেওয়া একের পর এক সিদ্ধান্তের ব্যাপক প্রভাব পড়ে দেশ ও দেশের বাইরে। সিএনএন ও রয়টার্স-ইপসোস পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে ৫২ শতাংশ নাগরিক।
কংগ্রেসের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ সীমান্তে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলাম। সেনা এবং বর্ডার প্যাট্রল টিম মোতায়েন করেছিলাম। যার ফলস্বরূপ গত মাসে অবৈধ অনুপ্রবেশ ছিল সবচেয়ে কম। নিজের ভাষণে অবৈধ অভিবাসীদের বর্বর বলেও আখ্যায়িত করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি সেন্সরশিপের অবসান ঘটানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সরকারি বাজেটে ভারসাম্য আনার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে কর হ্রাসের জন্য আইনপ্রণেতাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ইতিমধ্যেই ৩৬ ট্রিলিয়ন ঋণে থাকা দেশটির আরও পাঁচ ট্রিলিয়ন বৃদ্ধি পেতে পারে।
তার ভাষণের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণাকালে বক্তৃতার সাদৃশ্য থাকলেও, নির্ধারিত বক্তব্যের বাইরে উটকো মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন তিনি। তবে তার সমালোচনা থেকে রেহাই পাননি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, বাইডেন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ২ কোটি ১০ লাখ অভিবাসী অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেছেন। তিনি বলেছেন, তাদের মধ্যে অনেককেই বিপজ্জনক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার ভাষণের সময় বিভিন্নভাবে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। তাদের হাতে থাকা কাগজে লেখা ছিল ‘এটা স্বাভাবিক নয়’সহ বিভিন্ন রকম স্লোগান। অনেকে আবার মাঝপথে বেরিয়ে যান।
কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প আবারও ভারতের আরোপিত শুল্ক ব্যবস্থাকে অন্যায্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২ এপ্রিল থেকে ভারতসহ কয়েকটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, অন্য দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিরুদ্ধে শুল্ক ব্যবহার করেছে। এখন আমাদের পালা তাদের বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ করার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ব্রাজিল, ভারত, মেক্সিকো ও কানাডা আপনারা নিশ্চয়ই এদের নাম শুনেছেন? এবং আরও অসংখ্য দেশ আমাদের তুলনায় অনেক বেশি শুল্ক ধার্য করে। এটি সম্পূর্ণ অন্যায্য।
নিজের বক্তব্যে ধনকুবের ইলন মাস্কের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের আদেশে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সরকারি সক্ষমতা বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাস্ক। এই সংস্থার পরামর্শে ট্রাম্প প্রশাসন ফেডারেল কর্মীদের ছাঁটাই ও বরখাস্তের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এছাড়া বৈদেশিক সহায়তায় কোটি কোটি ডলার স্থগিতসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতেও তহবিল আটকে রাখা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, শত শত বিলিয়ন ডলারের জালিয়াতি চিহ্নিত করে যথাযথ পরামর্শ দিয়েছেন মাস্ক। যদিও তার এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এদিকে, ট্রাম্পের ভাষণের আগে ক্যাপিটল হিল এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে সেখানে জড়ো হন বিক্ষোভকারীরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তার প্রশাসনের নতুন বিভাগ ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট ইফিসিয়েন্সির দায়িত্বে থাকা ধনকুবের ইলন মাস্ক ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করতেও দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের। কারও কারও হাতে দেখা যায় ইউক্রেনের পতাকা।
এর আগে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সবশেষ কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। এর কয়েক সপ্তাহ পরই কভিড-১৯ মহামারী গোটা বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছিল। তবে সে বছর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হন ট্রাম্প। ২০২৪ সালের সবশেষ নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে আবারও হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তন হয় ট্রাম্পের।