রোজা শুধু আল্লাহর জন্য

রোজা শুধু আল্লাহর জন্য। আল্লাহতায়ালা নিজের সঙ্গে রোজার সম্পর্ক ঘোষণা করেছেন। এমনকি তিনি সব ইবাদত-বন্দেগি থেকে রোজাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছেন। হাদিসে কুদসিতে রাসুল (সা.) বলেন, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য। কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম, তা শুধু আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। বান্দা আমার সন্তুষ্টির আশাতেই খাদ্য, পানীয় ও সম্ভোগ বর্জন করে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম)

রমজানের রোজা মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ এনে দেয়। গুনাহের কারণে মহান আল্লাহ ও তার বান্দার মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়। ফলে আল্লাহর সঙ্গে তার বান্দার সম্পর্ক শিথিল হয়ে যায় এবং পরিণামে বান্দা তার রবের করুণা থেকে বঞ্চিত হয়। রমজানে বান্দাদের ওপর মহান আল্লাহর অজস্র রহমত ও করুণা বর্ষণ হয়। আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়, যে শিথিলতা দেখা দেয়, রমজানের রোজা তা দূর করে দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজান উপস্থিত হয় তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিশপ্ত শয়তানগুলোকে শেকলবদ্ধ করে রাখা হয়। তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। ফেরেশতাদের মারফত বলে দেওয়া হয়, হে নেককার লোকজন! তোমরা সওয়াবের কাজসমূহ সম্পন্ন করো এবং বদকারদের বলে দেওয়া হয়, তোমরা পাপ কাজ থেকে বিরত থাকো।’ (মুসনাদে আহমদ)

রোজা মানুষকে অশ্লীল কার্যাবলি এবং অযথা কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে। রোজা বান্দাকে তার হাত-পা, নাক-কান, জিহ্বা এমনকি অন্তরকেও নিয়ন্ত্রণে রাখার শিক্ষা দেয়। রোজা হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ, যাতে করে মানুষ সারা বছর এভাবে চলতে পারে। যেমন শেষ রাতে সাহরি খাওয়া, নির্দিষ্ট সময়ের আগে পানাহার বন্ধ করা, সূর্যাস্তের পর পরই নির্দিষ্ট সময়ে ইফতার করা যাতে আগে কিংবা পরে না হয়। আবার ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ ও পানাহারের পর রুটিন অনুযায়ী এশা ও তারাবির নামাজের জন্য প্রস্তুত হওয়াও একটি প্রশিক্ষণ। এই এক মাস যে ব্যক্তি রোজার মাধ্যমে তাকওয়া ও ভালো কাজের অনুশীলন করে, বছরের বাকি এগারো মাস সেটার প্রতিফলন ঘটে।

রোজার সঙ্গে তারাবির নামাজের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তারাবি শব্দের অর্থ প্রশান্তি লাভ করা, বিশ্রাম নেওয়া। তারাবির নামাজ পড়াকালে প্রতি চার রাকাত পরপর বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে তাসবিহ ও দোয়া পাঠ করা হয়। তাই এই নামাজকে তারাবির নামাজ বলা হয়। ইসলামি পরিভাষায় রমজান মাসে এশার নামাজের পর আদায়কৃত সুন্নত নামাজকে তারাবির নামাজ বলে। (কামুসুল ফিকহ)

ইবাদত হিসেবে তারাবির নামাজের গুরুত্ব অনেক। কেননা রাসুল (সা.) তারাবির নামাজ আদায়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। আবার তিনি এই ইবাদত নিয়মিতভাবে আদায় করলে উম্মতের ওপর তা ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করেছেন। তাই তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। নারী-পুরুষ সবার জন্যই এ হুকুম প্রযোজ্য। তারাবির নামাজ দশ সালামে ২০ রাকাত। এটি খোলাফায়ে রাশেদিন এবং অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে প্রমাণিত। দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর নির্দেশে সাহাবিদের শ্রেষ্ঠ কারি হজরত উবাই ইবনে কাবের ইমামতিতে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ জামাতের সঙ্গে প্রচলন হয়। যা মক্কা ও মদিনাসহ সারা বিশ্বে আজ অবধি চলমান। তবে করোনার কারণে মক্কা-মদিনায় সাময়িকভাবে তারাবির নামাজ ১০ রাকাত করা হয়েছিল, যা এবারও অব্যাহত রয়েছে।

তারাবি নামাজ পাপমোচনের অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়তে উৎসাহিত করে বলতেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে আল্লাহর একান্ত সন্তুষ্টির জন্য রমজান মাসে তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ মুসলিম)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন। আর আমি তোমাদের জন্য তারাবির নামাজকে সুন্নত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসে দিনের বেলায় রোজা পালন করবে এবং রাতে তারাবির নামাজ আদায় করবে, সে ব্যক্তি গুনাহ থেকে এরূপ পবিত্র হয়ে যাবে, যেরূপ নবজাতক শিশু মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়।’ (নাসায়ি)

যথাযথভাবে রোজা পালন না করলে রোজার বরকত হাসিল হবে না। রোজা অবস্থায় কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করা যাবে না। কেউ গালি দিলে বা ঝগড়া করলে তার প্রতি উত্তরে ‘আমি রোজাদার’ বলে তার সঙ্গে ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে বিরত থাকতে হবে। রোজা গরিবের অভুক্তের যন্ত্রণা উপলব্ধি করার একটি মাধ্যম, যাতে করে ধনবান ব্যক্তিরা বুঝতে পারে যে, না খেয়ে থাকা কত কষ্টকর এবং যাতে তারা গরিবদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। রমজানের রোজা মানুষের মনের রিপুগুলোকে সংযত করে, দরিদ্র ও ক্ষুধার্তদের দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা হৃদয়ঙ্গম করতে সাহায্য করে এবং মানুষকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। রোজা থাকা অবস্থায় অনেক হালাল বস্তুর ব্যবহার পরিহার করতে হয়। এর দ্বারা যেমন আল্লাহ কর্র্তৃক নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে বিরত থাকার অভ্যাস গড়ে ওঠে, তেমনি ব্যক্তির জীবনে ত্যাগের মনোভাবও সৃষ্টি হয়।