রাজধানীর গুলশানের একটি বাসায় তল্লাশির নামে তছনছ, ভাঙচুর ও লুটপাটের চেষ্টার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপির গুলশান থানা পুলিশ। গ্রেপ্তাররা হলো শাকিল খন্দকার (২৪), জুয়েল খন্দকার (৪৮) ও শাকিল আহমেদ (২৮)। জুয়েল খন্দকার ও শাকিল খন্দকার সম্পর্কে পিতা-পুত্র। এছাড়াও রাজধানীর ভাটারা থানাধীন একটি আবাসিক এলাকায় ‘মব’ তৈরি করে দুই ইরানি পর্যটককে মারধরের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ভাটারা থানা-পুলিশ। অন্যদিকে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন এলাকা থেকে আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে’ গ্রুপের সদস্য মো. রাব্বি ওরফে কানা রাব্বিকে (২১) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৪।
গুলশানে তল্লাশির নামে তছনছ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে গতকাল বুধবার বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার রাত প্রায় ১২টার দিকে গুলশান-২ এর রোড নম্বর ৮১-এ অবস্থিত ৮/আই নম্বর বাসার চতুর্থ তলায় সাবেক এমপি তানভীর ইমামের সাবেক স্ত্রীর ফ্ল্যাটে দরজা ভেঙে তল্লাশির নামে কয়েক জনের একটি দল ঢুকে পড়ে। বাসাটিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ, অবৈধ অস্ত্র ও আওয়ামী লীগের দোসরদের লুকিয়ে রাখা হয়েছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশির অজুহাতে ভাঙচুর করে লুটপাটের চেষ্টা করে। পরে ৯৯৯-এর কলের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে গুলশান থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় বাসার কেয়ারটেকার আব্দুল মান্নান বাদী হয়ে গ্রেপ্তার তিনজনসহ অজ্ঞাতনামা ১৪/১৫ জনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য সম্পর্কে থানা সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া শাকিল আহমেদ এক সময় বাসাটিতে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি মূলত জনতাকে তথ্য দিয়েছেন যে বাসাটিতে তল্লাশি চালালে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে। তারা মূলত লুটপাটের উদ্দেশে উক্ত বাসায় প্রবেশ করেছিল মর্মে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়। গ্রেপ্তারদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
‘মব’ তৈরি করে দুই ইরানি পর্যটককে মারধরের অভিযোগে গ্রেপ্তার ২: রাজধানীর ভাটারা থানাধীন এলাকায় ‘মব’ তৈরি করে ইরানের দুই নাগরিকসহ তিনজনকে মারধরের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম গতকাল বুধবার দুপুরে জানান, গত মঙ্গলবার দুপুরে ভাটারা থানার একটি আবাসিক এলাকায় বিদেশি মুদ্রা বদলে বাংলাদেশি টাকা নিতে একটি প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন ইরানের দুই নাগরিক। ওই সময় সেখানে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের মুদ্রা বিনিময় নিয়ে তর্ক হয়। এর জেরে ইরানের দুই নাগরিককে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে ‘মব’ (লোক জড়ো) সৃষ্টি করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের নামে মামলা হয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ দুই বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে। আহত ইরানের দুই নাগরিক হলেন মোহাম্মদ আহমদ (৭৪) ও তার নাতি মো. মেহেদী (১৮)। তারা বাংলাদেশে ঘুরতে এসেছেন। পুলিশ জানায়, আহত অন্যজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই বাংলাদেশি দুই বিদেশি নাগরিককে তার গাড়িতে করে নিয়ে এসেছিলেন। ঘটনার পর তিনি পালিয়ে যান। ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ দুই ইরানিকে উদ্ধার করে।
‘ভইরা দে’ গ্রুপের সদস্য কানা রাব্বি গ্রেপ্তার : রাজধানীর পল্লবী থানাধীন এলাকা থেকে আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে’ গ্রুপের সদস্য মো. রাব্বি ওরফে কানা রাব্বিকে (২১) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৪। গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল র্যাবের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাব্বিকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রাজধানীর পল্লবী থানাধীন এলাকায় বেশ কিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। যার মধ্যে কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে’ গ্রুপের ২০ থেকে ২৫ সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এই গ্যাংয়ের সদস্যরা পল্লবী থানাধীন কালশীসহ আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মারামারি, মাদক সেবন ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত। চিহ্নিত এসব বেপরোয়া ও মাদকসেবী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অত্যাচারে স্থানীয় লোকজন অতিষ্ঠ ও অসহায় হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে গ্রুপ’-এর ওপর বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়। গ্রেপ্তার হওয়া আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। ভবিষ্যতেও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে র্যাব-৪-এর সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
গুলশানের বাসায় মব তা-বের কুশীলব কেয়ারটেকার : প্রেস উইং
মধ্যরাতে ‘মব’ তৈরি করে গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর ইমামের সাবেক স্ত্রীর বাসায় ঢুকে তল্লাশির নামে মালামাল তছনছ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পেছনে ওই ভবনের সাবেক কেয়ারটেকারের হাত রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
গতকাল বুধবার প্রেস উইংয়ের এক বার্তায় বলা হয়, শাকিল আহমেদ নামের ওই ব্যক্তি লোক জড়ো করেন এবং বাসাটিতে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে, এমন তথ্য দিয়ে সেখানে তল্লাশি চালাতে উসকানি দেন।
গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের এ ঘটনায় ভবনের সাবেক কেয়ারটেকার শাকিল (২৮) ছাড়া জুয়েল খন্দকার (৪৮) এবং তার ছেলে শাকিল খন্দকার (২৪) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তানভীর ইমাম সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি)। তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রয়াত এইচ টি ইমামের ছেলে। গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে শতাধিক মানুষ গুলশান-২ নম্বরে ৮১ নম্বর সড়কের একটি ভবন ঘেরাও করে বলতে থাকেন, সেখানে তানভীর ইমামের কয়েকশ কোটি টাকা রাখা আছে। তারা রাত ১২টার পর ওই ভবনে ঢুকে তল্লাশির নামে তা-ব চালায়।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বলেছে, গুলশানের ওই বাসায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ, অস্ত্র ও আওয়ামী লীগের দোসরদের লুকিয়ে রাখা হয়েছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে মধ্যরাতে ‘তল্লাশি’র নামে ২০ থেকে ২৫ জন লোক দরজা ভেঙে বাসায় ঢুকে পড়েন। তারা তল্লাশির অজুহাতে বাসায় ঢুকে মালামাল তছনছ, ভাঙচুর ও লুটপাটের চেষ্টা করেন।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গুলশান জোনের পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সেখান থেকে শাকিল খন্দকার, জুয়েল খন্দকার ও শাকিল আহমেদ নামের তিন ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রেস উইং থেকে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে শাকিল আহমেদ একসময় ওই বাসায় কেয়ারটেকারের (তত্ত্বাবধায়ক) কাজ করতেন। তিনিই মূলত জনতাকে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে, এমন তথ্য দিয়ে বাসায় তল্লাশি চালাতে উসকানি দেন।
প্রেস উইং থেকে আরও বলা হয়, এর আগে গত পরশু রাত সাড়ে ১০টার দিকেও একই অজুহাতে একদল জনতা বাসায় ঢোকার চেষ্টা করে। পরে পুলিশ এসে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মর্মে আবারও সতর্ক করছে যে, কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেন। কোথাও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী থানাকে জানানো হয়। সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সচেষ্ট রয়েছে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে বদ্ধপরিকর।