জার্মানিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে রমজান

জার্মানিতে প্রায় ৫০ লাখ মুসলমান বসবাস করেন, যাদের অনেকেই বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে এসেছেন। স্থানীয় মুসলমানের সংখ্যাও কম নয়। ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার সংখ্যাও বাড়ছে। তাই মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পবিত্র রমজান মাস পালনসহ ইসলামের অন্যান্য মৌলিক বিষয়াবলি জার্মানির সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গত বছর রমজান উপলক্ষে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে বর্ণিল আলোকসজ্জার আয়োজন করা হয়েছিল। এ বছরও পবিত্র রমজানের গুরুত্ব তুলে ধরতে ‘রামাদান কারিম’, ‘হ্যাপি রমাদান’ লেখা নিয়নসাইন শোভা পাচ্ছে রাজধানী বার্লিনের সিটি করপোরেশন ভবনে। তবে জার্মানির মুসলমানদের ওপর নিরীক্ষণ করে জানা যায়, এখানে রমজান পালন কখনো আনন্দদায়ক, আবার কখনো সাংস্কৃতিক ও ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীনও হতে হয়।

মুসলমানদের জন্য রমজান মাস সামাজিকতা এবং একটি অভিন্ন বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঐক্যের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বার্লিনের শিক্ষা, সংহতি ও গণতন্ত্রবিষয়ক আঞ্চলিক কার্যালয়ে কর্মরত আছেন আমিনেস তাশদান। তার মতে, মুসলিম দেশে রোজা রাখা স্বাভাবিক জীবনের একটি অংশ, কিন্তু জার্মানে তা নয়। বেশিরভাগ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে রোজার কারণে এক ধরনের উচ্ছ্বাসের অনুভূতি তৈরি হয়। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে রোজা রাখা এবং সম্প্রদায়ের সবার সঙ্গে ইফতার করার অনুভূতি অনেক বেশি আনন্দদায়ক, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে পাওয়া যায় না। তুরস্কে রমজান মাসে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় এবং সন্ধ্যার নামাজে মসজিদগুলোতে থাকে উপচেপড়া ভিড়। কিন্তু এখানে সে রকমটা কম হয়। মসজিদগুলোও অনেক দূরত্বে অবস্থিত। তবে জার্মানিতে একাধিক ইসলামি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উপায়ে ব্যাপকভাবে রমজানের আনুষ্ঠানিকতা তৈরির চেষ্টা করছে।’

জার্মানে রাত ছোট, কর্মঘণ্টা দীর্ঘ। তাই কর্মক্ষেত্রে রোজা রাখা অনেক মুসলমানের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। মুসলিম দেশগুলোর অনেক জায়গায় রমজান মাসে কর্মঘণ্টা সংক্ষিপ্ত করা হয়, যেখানে লোকজন বিকেল ২টায় অফিস ছাড়েন। কিন্তু জার্মানিতে কর্মীদের সাধারণ সময়ানুযায়ী কাজ করতে হয়। গ্রীষ্মকালে যদি রমজান পড়ে, তবে সূর্যাস্ত হয় অনেক দেরিতে, ফলে মে বা জুন মাসে রোজাদারদের হয়তো রাত ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় ইফতারের জন্য।

বার্লিনের সুইডিশ ফার্নিচার কোম্পানি আইকেইএ রমজানে কর্মঘণ্টার মধ্যে সমন্বয় করতে একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের নীতি অনুসারে, মুসলিম কর্মীদের একসঙ্গে ইফতার করার জন্য সময় দেওয়া হয় এবং তাদের অমুসলিম সহকর্মীদেরও সেই অনুযায়ী বিরতি নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। যদি প্রতিষ্ঠানটির ক্যান্টিন ইফতারের সময় বন্ধ থাকে, তবে মুসলিম কর্মীরা সেখান থেকে বের হয়ে পাবলিক রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে পারেন। আমিনেস তাশদান বলেন, ‘আমার কর্মস্থলে রমজানের প্রতি খুব একটা বিবেচনা করা হয় না। আমার পরিচিত মুসলিমদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আমাদের জন্য একটু ছাড়ের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয়, যেমন কর্মঘণ্টা কিছুটা কমিয়ে দেওয়া।’

যদিও রমজান এখন জার্মানির সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে, তবুও অনেক অমুসলিমের কাছে এটি সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তবে তারা মুসলিম রীতিনীতি সম্পর্কে জানতে খুব একটা প্রশ্ন করেন না, বরং কেন মুসলমানরা স্বেচ্ছায় পানাহার না করে থাকেন, সেটাই বেশি জানতে চান।

তরুণ মুসলমানদের কথা তুলে ধরার জন্য ‘জুমা প্রকল্প’ গঠিত হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তরুণ মুসলমানদের বলা হয়, তারা যেন রমজান সম্পর্কে অমুসলিমদের কৌতূহলী ও অদ্ভুত প্রশ্নগুলোর সুন্দর জবাব দেয়। উগুর নামের এক তরুণ এই ধরনের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘‘আমি প্রায়ই হাসি যখন শুনি, ‘তোমরা কীভাবে এটা সহ্য করো?’ বা ‘এটা তো অসম্ভব!’ এটি আমাকে অনুভব করায় যে আমরা মুসলমানরা খুবই দৃঢ় ও ধৈর্যশীল।”

এখন রমজান শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জার্মান রাজনীতিবিদদের দৈনন্দিন আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে। কয়েক বছর আগে জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ওয়াল্টার স্টেইনমায়ার রমজান নিয়ে এক বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘এটি দেখতে ভালো লাগে যে, রমজান এখন জার্মানের সমাজের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠছে। এই উৎসব আমাদের শেখায় যে, আমরা একসঙ্গে আনন্দ করতে পারি, একসঙ্গে বসবাস করতে পারি এবং পারস্পরিক সম্মান ও যত্নের সঙ্গে একে অপরের প্রতি সুন্দর আচরণ করতে পারি।’

গ্যোটে ইনস্টিটিউট থেকে ভাষান্তর আতিকুর রহমান