গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পাচ্ছেন বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা

ঈদের আগে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন শপিংমল ও আবাসিক এলাকার নিরাপত্তায় বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের ‘অক্সিলারি ফোর্স’ বা ‘সহায়ক বাহিনী’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যারা পুলিশের মতোই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পাবেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। রমজান মাস ও ঈদ ঘিরে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের জনবল স্বল্পতার কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গতকাল শনিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপি প্রধান।

সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, পুলিশকে সহায়তাকারী হিসেবে ৫০০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের আইন বলে তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ সময় তিনি রাজধানীর ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো দাবি করে বলেন, ‘যা হচ্ছে তা স্ট্রিট পেটি ক্রাইম। মানে ছোট-খাটো অপরাধ।’

এ ছাড়াও ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আগে রাজধানীবাসীকে নিজ দায়িত্বে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরামর্শ দেন রাজধানীর পুলিশ প্রধান।

এদিকে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়ক ফোর্স হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ ধরণের সহায়ক ফোর্সকে গ্রেপ্তারি ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি কতটা যৌক্তিক এবং ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ছাড়া গ্রেপ্তারের অনুমতি দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। নগরবাসীর নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আজ (গতকাল) ৭ রমজান চলছে। সন্ধ্যা হলে ঢাকাবাসী মুসল্লিরা মসজিদে যান। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা তারাবির নামাজের সময় যায়। ওই সময় ঢাকা শহরের বিভিন্ন অলি-গলিতে জনশূন্যতা তৈরি হয়। বিশেষ করে পুরুষরা তারাবির নামাজে থাকেন। এই সময় আপনাদের বাড়ির ফ্ল্যাট ও দোকান সযতেœ রেখে আসতে হবে। নিরাপত্তা খেয়াল করবেন। আশা করছি, ১৫ রমজান থেকে ঢাকাবাসীর অনেকেই ঈদ উপলক্ষে গ্রামে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে যাবেন।’

নগরবাসীর নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হিসেবে আপনাদের জানাতে চাই এবং অনুরোধ করতে চাই, যখন আপনারা বাড়ি যাবেন, তখন আপনার বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজ দায়িত্বে নিশ্চিত করবেন। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। আমাদের পুলিশের স্বল্পতা রয়েছে। অনেকেই ছুটিতে যাবে বা যেতে চায়। যারা ব্যারাকে থাকেন, তারা দীর্ঘ সময় পরিবার ছাড়া থাকেন, তাদের একটা পার্সেন্টেজকে (শতাংশকে) সরকারের নির্দেশে ছুটি দিতে হয়।’

সহায়ক বাহিনী নিয়োগ প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার সাজ্জাত আলী বলেন, ‘শপিং সেন্টারগুলো অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকবে। বিভিন্ন শপিং মল ও গেট দিয়ে ঘেরা বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় মেট্রোপলিটন পুলিশ আইন অনুযায়ী অক্সিলিয়ারি পুলিশ ফোর্স নিয়োগের ক্ষমতা আমার আছে। সেই ক্ষমতা অনুযায়ী আমি বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের অক্সিলিয়ারি পুলিশ ফোর্স হিসেবে নিয়োগ দিয়েছি। তাদের হাতে একটি ব্যান্ড থাকবে, যাতে লেখা থাকবে সহায়ক পুলিশ কর্মকর্তা। আইন অনুযায়ী তারা দায়িত্ব পালন ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পাবেন। পুলিশ অফিসার যেভাবে আইনগতভাবে প্রটেকশন (সুরক্ষা) পান, এই অক্সিলিয়ারি ফোর্সের সদস্যরাও সেই প্রটেকশন পাবেন।’

ঢাকায় যা ঘটছে তা ‘স্ট্রিট পেটি ক্রাইম’ : রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো, যা হচ্ছে তা ‘স্ট্রিট পেটি ক্রাইম’। যেমন- মোবাইল টান দেওয়া। তারা মোবাইল নিয়ে দৌড় দেয়। এর চেয়ে সহজভাবে কোনো অপরাধ করা যায় না। সবচেয়ে ছোট অপরাধটি করা সহজ। যারা এ কাজটি করছে তাদের বয়স ১৫-২০ বা ২২ বছর।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপি প্রধান আরও বলেন, ‘ঢাকা একটি মেগাসিটি এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি। এ শহরে নানাবিধ সমস্যা আছে। সেই কথাটি আমি বলতে চাই না। ইদানীং ঢাকা মহানগরীতে বড় ধরনের অপরাধ (খুন-ডাকাতি) খুবই কম। ৮০-৯০ ভাগ ক্ষেত্রে যে অপরাধটি হয়, সেটি করেন উঠতি বয়সের ছেলেরা। আমরা যাদের কিশোর গ্যাং বলি। বাস, প্রাইভেটকার, মোটরবাইকের যাত্রী হয়তো মনোনিবেশ করেন কথায়, তখন পেছন থেকে এসে মোবাইলটা টান দিয়ে দৌড় দেয়। এমন কিছু স্ট্রিট ক্রাইম হচ্ছে।’

অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সাজ্জাত আলী বলেন, ‘পরিসংখ্যান দেখেন বা অন্য দেশের বড় বড় শহরের অপরাধচিত্রের সঙ্গে একটি তুলনামূলক চিত্র দেখেন। দেখবেন সেই চিত্রে ঢাকা শহরে অপরাধের সংখ্যা কম। আমি বলেছিলাম আমার থানায় ৫০০ মামলা হলে দায়-দায়িত্ব পুলিশ কমিশনারের। আপনারা কোনো মামলা নিতে না করবেন না বা গড়িমসি করবেন না। আমার জানা মতে, এখন মামলা রিফিউজড (নথিভুক্ত করতে প্রত্যাখ্যান) করি না, ঘটনার সত্যতা থাকলে আমরা মামলা গ্রহণ করি।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক, যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) রবিউল ইসলাম ও মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম এবং রমনা জোনের ডিসি মাসুদ আলম।

ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ছাড়া গ্রেপ্তারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন : ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়ক ফোর্স হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়ক ফোর্স হিসেবে গ্রেপ্তারি ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি কতটা যৌক্তিক এবং ম্যাজিস্ট্রেটি ক্ষমতা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, কেউ অপরাধ করলে তাকে আটক করে থানায় দিতে পারবে, কিন্তু কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা জরুরি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের গ্রেপ্তারি ক্ষমতা দেওয়া হলে তার সুফলের চেয়ে বরং অপব্যবহার হতে পারে।

ডিএমপি অধ্যাদেশের ১০ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘পুলিশ কমিশনার যেকোনো ব্যক্তিকে বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য সহায়ক পুলিশ অফিসার হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন, যখন তার মনে হয় যে, বাহিনীর এ ধরনের সহায়তার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি সহায়ক পুলিশ অফিসারের নিয়োগের সময় ও নির্দিষ্ট নম্বর থাকবে এবং কাজ শেষে এই সহায়ক পুলিশ ফোর্সদের একটি সার্টিফিকেটও দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রায় পুলিশের মতো ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের জন্য দায়ী থাকবে, শাস্তির জন্য দায়ী থাকবে এবং অন্য যেকোনো পুলিশ কর্মকর্তার মতো একই কর্র্তৃত্বের অধীন হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘দেশের বর্তমান অবস্থা পুলিশের একার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ডিএমপি কমিশনার যেটা বলছেন তার সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা সহায়ক পুলিশ ফোর্স হিসেবে কাজ করবে ঠিক আছে, কিন্তু তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া ঠিক হবে না। তারা অপরাধীকে আটক করবে, পরে সেই অপরাধীকে থানায় দেবে এটা হতে পারে। কিন্তু সরাসরি গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। এই সহায়ক পুলিশ অপরাধ দমনে যতটা না গুরুত্ব পাবে, তার চেয়ে বেশি অপব্যবহার হতে পারে।’ তবে এই সহায়ক পুলিশ ফোর্সের ভাবনাকে ইতিবাচক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা সহায়ক পুলিশ ফোর্স হিসেবে কাজ করলে তার ফলাফল ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটোই হতে পারে বলে মনে করছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্সের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা সহায়ক পুলিশ ফোর্স হিসেবে কাজ করতে পারেন এবং গ্রেপ্তারি ক্ষমতা থাকতে পরে। কিন্তু ক্ষমতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে বা পরিচালনা হবে সেটাই দেখার বিষয়। ঢালাওভাবে এই সহায়ক ফোর্স না করে পরীক্ষামূলকভাবে করে দেখা যেতে পারে। কারণ সহায়ক হিসেবে যারা কাজ করবে তাদের সঙ্গে অপরাধীদের সম্পৃক্ততা কতটুকু আছে সেটা যাচাই-বাছাই না করা হলে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি হবে।’ এমন সহায়ক ফোর্সের ক্ষেত্রে নজরদারি শক্তিশালী করতে হবে বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।