বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে সমাজ ও পরিবারে নারীর কৃতিত্বকে স্মরণ ও সম্মান জানাতে প্রতিবছরের মতো গতকাল শনিবার পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশেও সরকারি, বেসরকারি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন ও সংস্থা দিবসটি পালন করেছে। এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন নারী ও কন্যার উন্নয়ন’। দিবসটি দেশব্যাপী উদযাপনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়।
দেশে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে অনেকটা উত্তাল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পালিত হয়েছে এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটির বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে নারী ও শিশু নির্যাতনকারীদের কঠোর হাতে দমনের দাবি ওঠেছে। এ সব কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়া নারী নির্যাতন এখনই বন্ধ না করা গেলে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সকাল ১১টায় ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আলোচনা সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) উদ্যোগে এদিন সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর বনানীর বেলতলা থেকে কড়াইল মাঠ পর্যন্ত রিকশা শোভাযাত্রা হয়। দুপুরে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের উদ্যোগে শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু করে কাকরাইল মোড় হয়ে পুনরায় বিএনপি অফিসের সামনে এসে শেষ হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দিবসটি উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাণী দেন। বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। তারা এগিয়ে যাচ্ছে সর্বক্ষেত্রে।’
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, নারীসমাজ যাতে অবহেলা, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে সবার সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
প্রশ্নবিদ্ধ আইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না : জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব সামান্তা শারমিন বলেছেন, নাগরিক অধিকারের সঙ্গে নারীর যে অধিকার তা নিশ্চিত করে আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কোনো প্রশ্নবিদ্ধ আইন দিয়ে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। গতকাল বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে নারীদের প্রতি সংঘটিত ধারাবাহিক সহিংসতা, নিপীড়ন ও সাইবার হয়রানির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
বিক্ষোভ সমাবেশে অভ্যুত্থানে শহীদ মোহাম্মদ সোহাগের স্ত্রী রিমা আক্তার, ছাত্রনেত্রী শ্যামলী সুলতানা জেদনী, মোহাম্মদপুর বেড়িবাধের প্রতিনিধি ময়না আক্তার, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম প্রমুখ বক্তব্য দেন।
সমাবেশে নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বলেন, ‘এই সরকার নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। অভ্যুত্থানের সময় সামনের সারিতে ১০০ নারী দাঁড়িয়ে গেলে আমাদের এক হাজার জনের সমান অনুপ্রেরণা জোগাত। তারাই হাসিনার আসনে কাঁপন ধরিয়েছে। অভ্যুত্থানে জনপরিসরে বোনেরা যখন সামনের সারিতে লড়াই করেছে তখন কেউ কথা বলতে পারেনি। কিন্তু এখন তারাই যখন রাজনীতিতে আসছে তখন তাদের টার্গেট করা হচ্ছে, মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে।’
শহীদ মাসুদ রানার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সাফা বলেন, ‘আমার স্বামীর মৃত্যুর ৭ মাস না যেতেই শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হচ্ছি, আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে ৭ মাস আগে আমাদের সুখের সংসার ছিল সেখানে আমরা এখন অসহায়। এখন পর্যন্ত আমাদের একবারও খোঁজ নেওয়া হয়নি আমরা কেমন আছি, আমরা কিভাবে আমাদের সšানদের লালন-পালন করছি।’
পথেঘাটে নারীকে হেনস্তা কেন : অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেছেন, ৫ আগস্টের বিপ্লবে তরুণরা বুকের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছেন। যেখানে ফ্যাসিস্ট সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে, সেখানে কেন এখনো নারীরা ধর্ষিত হচ্ছেন, বাসে ধর্ষিত হচ্ছেন? কেন পথেঘাটে নারীদের নির্যাতন-হেনস্তা করা হচ্ছে? একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলছে! আন্তর্জাতিক নারী দিবসে গতকাল মহিলা দল আয়োজিত শোভাযাত্রাপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্টাফ রিকশা থামিয়ে এক মেয়েকে বলছে যে, তোমার এই পোশাক পরা ঠিক হয়নি। আমরা শুনছি এখন ওড়নাকা-, পোশাককান্ড। একটা তো মব কালচার, আরেকটা কোথায় যেন উগ্রবাদী গোষ্ঠী কাজ করছে। পুরুষ এবং মেয়ে আমরা হলাম মানব সম্প্রদায়। যিনি প্রথম ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন, তিনি তো একজন মহিলা বিবি খাদিজা (রা.)। তাহলে নিজেকে কেমন করে চলতে হবে, সন্তানকে কীভাবে মানুষ করতে হবে, এই ইনস্টিটিউশন তো হচ্ছে মা। আর মা তো একজন নারী। বাবা সত্য কথা বলিস, মিথ্যা কথা বলিস না, শিক্ষকদের সম্মান করিস, মুরুব্বিদের সম্মান করিস। এটা কে শেখায় সন্তানকে? সেটা হলো মা।’
মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাসের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদের সঞ্চালনায় এ সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়।