দেশে স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৪ বছর করার প্রস্তাব দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমন তথ্য জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেছেন, অন্যান্য ক্যাডারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩০ বছর থাকলেও, বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের ক্ষেত্রে এটি ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছিল। কারণ এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনে পাঁচ বছর এবং ইন্টার্নশিপে এক বছর সময় লাগে। পরে সব ক্যাডারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩২ বছরে উন্নীত করা হলেও স্বাস্থ্য ক্যাডারকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এটি ৩৪ বছর করার প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ সহকারী এই তথ্য জানান। এ সময় তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
শিগগিরই ২ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ: সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ৪৫, ৪৬ এবং ৪৭ বিসিএসে যথাক্রমে ৪৫০ জন, ১৬৮২ ও ১৩৩১ জন চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ চলমান আছে। তিনটি বিসিএস চলমান থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করায় একটি বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে ২ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গত ৯ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই বিশেষ সহকারী আরও বলেন, ‘প্রায় সাড়ে ৭ হাজার পদোন্নতিযোগ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে পদের অভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম তালিকার বিষয়ে সম্মতি এসেছে। এটি আর্থিক সংশ্লেষের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় পাঠিয়েছি। দ্বিতীয় তালিকাটি আমরা আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসনে পাঠিয়েছি, তৃতীয় তালিকা অধিদপ্তরে তৈরি করা হচ্ছে। আমরা আশা করি, আগামী সপ্তাহে আমাদের এখানে সেটি এসে পৌঁছাবে। এ ছাড়া নার্সসহ অন্য সব সহায়ক জনশক্তির নিয়োগের প্রক্রিয়াকেও গতিশীল করেছি, যেন সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে সব শূন্যপদ পূরণ করা যায়।’
বিশেষ সহকারী আরও বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষানবিস চিকিৎসকদের ভাতা বৃদ্ধির বিষয়ে গত জানুয়ারি থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। জুলাই থেকে তাদের ভাতা বাড়ানোর বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’
স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে : স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনটি সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে বলে জানিয়েছেন ডা. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে আইনে কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্তি, বর্জন বা পরিমার্জনের জন্য কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে, যা শিগগিরই পাওয়া যাবে। অতিসত্বর স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন বা নাম পাল্টে স্বাস্থ্য বা চিকিৎসক সুরক্ষা আইন আগামী দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে জনসমক্ষে আনতে পারব। চিকিৎসা সেবাগ্রহীতা এবং সেবাদাতা দুদিক থেকে দুটি আলাদা আইন হতে পারে।
নতুন ব্যবস্থাপনায় চলবে স্বাস্থ্য খাত : আগামী বছরের জুনের মধ্যে নতুন ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য খাত পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছেন ডা. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা ২৬ বছর ধরে চলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা একটা মৌলিক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছি। ট্রানজিট পরিকল্পনা হিসেবে ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। বর্তমানে নগরবাসীর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কোনো ভালো কাঠামো নেই। সেজন্য জেনারেল প্র্যাকটিশনারভিত্তিক একটি রেফারেল সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেটি সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ হবে বলে আমরা আশা করছি।’
বিশেষ সহকারী আরও বলেন, ‘সরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগসের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের সব মানুষের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের চাহিদা পূরণের জাতীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারব আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই।’
ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ : ডেঙ্গু নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সায়েদুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের ভিকটিম। এবার ডেঙ্গুর প্রোফাইলিং করেছি। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গাইডলাইনে এবার মাইনর পরিবর্তন হবে বলে আমরা আশা করছি। সেগুলো নিয়ে কাজ হচ্ছে। সেটার ভিত্তিতে আমরা সারা দেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেব।’
চিকিৎসা সহকারীদের উপাধি নির্ধারণে কমিটি : এ সময় ডা. সায়েদুর রহমান আরও বলেন, ‘এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারীরাই ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করতে পারবেন এ-সংক্রান্ত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এ ছাড়া চিকিৎসা সহকারীরা কী উপাধি ব্যবহার করবেন, তা নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে একটি প্রত্যাশার কথা বলা হয়েছে এমবিবিএস ও বিডিএস সনদ ছাড়া কেউ স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করতে পারবে না। এ বিষয়ে আমরা আদালতের রায় পাওয়ার অপেক্ষা করছি, এরপর আইনি পরামর্শ অনুযায়ী আমরা তাদের মাধ্যমে কী ভাষায় প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে, সেটি নির্দিষ্ট করব।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী আরও বলেন, ‘মানহীন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলগুলো বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানহীন ম্যাটস স্কুল চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলোর ভর্তি বন্ধ আছে। চিকিৎসা শিক্ষার কোনো পর্যায়ে মানের বিষয়ে আমরা আপস করতে রাজি নই।’
ধৈর্য ধারণের অনুরোধ : বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের কাছে ধৈর্য ধারণ করার জন্য অনুরোধ জানান মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। আমরা এই দেশটির কল্যাণমুখী রূপান্তরের জন্য স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের চেষ্টা করছি এবং সে লক্ষ্যে আপনাদের সবার সহযোগিতা একান্ত কাম্য।’