এক বিভক্ত জাতির আকাঙ্ক্ষা যখন দলীয় সাফল্য

আপনি যখন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্পোর্টসকে পর্যালোচনা করবেন, দেখবেন আমাদের সব সাফল্য সেইসব খেলাকে ঘিরে যেখানে খেলোয়াড় শুধু একজন থাকে। উদাহরণ হিসেবে অ্যাথলেটিকস, আর্চারি, দাবা, শুটিং, সুইমিং, গলফ ইত্যাদি। কিন্তু দলগত খেলা যেমন ফুটবল, ক্রিকেট বা হকি এর মতো খেলায় বিশ্বমঞ্চে আমাদের সাফল্য একেবারে শুন্যের কোঠায়। নিজেদের কাবাডিতেও একই অবস্থা। শুধুমাত্র ফুটবলেই ছেলেমেয়ে উভয়ক্ষেত্রে সাফজয় আমাদের একমাত্র দলগত সাফল্য (শুধুমাত্র জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল এখানে আলোচ্চ‍্য বিষয় নয়)।

বাংলাদেশে আপনি যখন জন্ম নিবেন, তারপর মুহূর্ত থেকেই আপনার বাকি জীবন চলবে বিভাজনের মধ্যে দিয়ে। শুরুতেই আপনি হয় নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত ঘরের হবেন। এরপর হয় আপনি বাংলা মিডিয়াম বা ইংলিশ মিডিয়াম, তা পার হতেই আপনি হয় পাবলিক নয়ত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। বিভাজনের এই খেলা আপনাকে কখনোই ছাড়ে না তাই জীবনের কোনও ক্ষেত্রেই আমরা একটা দল হয়ে কাজ করতে শিখি না বা দলগত প্রচেষ্টাটাই আমাদের শেখা হয় না। খুব হাতেগোনা কয়েকজন আমাদের মাঝে খুবই সৌভাগ্যবান হয় যারা এমন পরিবেশ এর মধ্যে দিয়ে বড় হয় যেখানে একটা দলগত প্রচেষ্টা থাকে এবং দল হিসেবে কাজ করে। এমন বিভাজনের পরিবেশ থাকার কারণেই আমরা ভালো সমর্থক হওয়া শিখি না, ফলশ্রুতিতে আমরা নেতা হওয়াও শিখতে পারিনা। এর জন্য দেশে ভালো সমর্থক হয় না, আর বাংলাদেশে ভালো নেতার হাহাকার তো ইতিহাসে সবসময়ই ছিলো। এর জন্য বাংলাদেশে শুধু একটা জিনিসই আছে, তা হলো আন্দোলন।

১৭ই মার্চ ২০২৫ এ বাংলাদেশের সকল মানুষ এক ছাতার নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। সেই ছাতার নাম হচ্ছে হামজা চৌধুরী। ওইদিন বাংলাদেশ এর সাম্প্রতিক সকল নেগেটিভ নিউজ পজিটিভ নিউজ এ পরিণত হয়েছিল এবং এক ধাক্কায়  ফুটবল ফিরে পেয়ে গেল তার হারানো গৌরব। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই পুরো দেশ ফুটবল নিয়ে কয়েক টুকরায় ভাগ হয়ে গেল। কারণ একটাই, ফাহামিদুল ইসলাম বাংলাদেশে আসেননি। তাকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এই নিউজে ফ্যানরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে ফেলল। মেনস্ট্রিম মিডিয়াও এরপর ইস্যুটাকে বড় আকার ধারণ করাল এবং শেষমেশে ফ্যানরা মিছিল করে টিম হোটেল এর সামনে বিক্ষোভ করলো। পুরা সিচুয়েশন ম্যানেজ করার জন্য বাফুফে প্রেসিডেন্টকে পদক্ষেপ নিতে হলো ক্রীড়া উপদেষ্টা এর সাথে মিলে। এর মধ্যেই প্রাক্তন প্লেয়াররা তাদের কমেন্ট এর জন্য হুমকি খেয়েছেন, ক্লাবগুলোকে এর মধ্যে টেনে সিন্ডিকেটের তোকমা দিয়ে কোচ এর সাথে জড়িয়ে দোষারোপ করা হয়ে গিয়েছে। এই উত্তাল পরিস্থিতি এরমধ্যে এক পত্রিকা ফিচার করে হামজার ক্যারিকেচার এর ছবি সহ যা দেখে ফ্যানরা ব্যাপারটাকে নেগেটিভ মনে করে আরেক দফা সেই পত্রিকার উপর ক্ষোভ ঝাড়ে। সর্বশেষে এক পত্রিকা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে যে দলের এক গোলকিপার এর সাথে কথা কাটাকাটি এর রেষ ধরে ফাহমিদুলকে বাদ দেয়া হয়েছে তাই এরপর সেই গোলকিপারকে নিয়ে তুলধুনো শুরু হয়ে গিয়েছে।

ফুটবল এবং ক্রিকেট উভয়ই দলীয় খেলা। দলের প্লেয়ার, ফ্যান এবং ম্যানেজমেন্ট এর মধ্যে যত একতা থাকবে জয় এর সম্ভবনা ততই বেড়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ এ খেলা শুরুর আগেই প্লেয়ার, ফ্যান এবং ম্যানেজমেন্ট এতই বিভাজনের মধ্যে পরে যায় যে, খেলায় জয় লাভের উপর করো মনোযোগ থাকে না। প্লেয়াররা তাদের ব‍্যক্তিগত জীবন নিয়ে এতই শঙ্কিত থাকে যে তাদের পুরা ধ্যানধারনাই থাকে কোনও ভুল না করার। তাই কোনও প্রকার আউট অফ দ্য বক্স খেলা বা সৃজনশীল খেলা তাদের মধ্যে দিয়েও আসে না। প্লেয়াররা এক্কেবারে বেসিক কাজ করে সময়টা অতিবাহিত করে যাতে কোনও ভুল বা দোষ যেন তাদের ঘাড়ে না এসে পড়ে যাতে খেলার পর তাদের ব‍্যক্তিগত জীবনে কোনও প্রকার প্রভাব না পরে। ফ্যানরা যদিও ৯০ মিনিট প্লেয়ারদের অনেক সাপোর্ট দিয়ে যায় কিন্তু তাতে আসলে কোনও লাভ হয় না কারণ খেলার আগে প্লেয়ারদের এত প্রেসার এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয় যে প্রিপারেশনটাই ঠিক মতো নেয় হয়না। আর ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচে প্রিপারেশন বা প্রাকটিস ভালো না হলে কোনদিন ভালো ফলাফল আসেনা।

২৫শে মার্চের খেলায় বাংলাদেশের জয় এর একটা ভালো সুযোগ ছিলো কারণ পুরা দেশ অনেক বছর পর ফুটবল নিয়ে এক হয়েছিল এক হামজা এর কারণে। ঠিক যেভাবে ৮৬ এর পর আর্জেন্টিনা ২০২২ এ এক হয়েছিল মেসিকে ওয়ার্ল্ডকাপ জেতানোর জন্য। কিন্তু হামজা আসার পর ফাহামিদুল এর বিষয়টা নিয়ে যা ঘটল তাতে এটাই দেখিয়ে দিল আমরা সবাই মিলে আবার বিভাজনের পথেই হাঁটছি।

আমাদের শেষ একটা আশা ভরসা বাকি আছে। তা শুধু সম্ভব ম্যাচ এর দিন ঠিক খেলা শুরু হবার আগে। ম্যাচ শুরু হবার ঠিক আগে এই একটা সময়ই আছে যখন প্লেয়ার, ফ্যান এবং ম্যানেজমেন্ট সবাই একসাথে এক সুতায় বাঁধা পড়বে জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে। সর্বশেষ এই একটা সময় সবাই বিভাজনটা ভুলে, যার যার অবস্থান থেকে সরে এসে এক সাথে চা্ইবে যেন বাংলাদেশ ম্যাচটা জিতে বের হয়ে আসে। এরজন্যই ফুটবল তার পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে সবাইকেই শেষ একটা সুযোগ দেয় যেন আমরা আবার এক হয়ে যাই। তবে হয়ে যাক আবারও, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।