ইউরোপের সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত দেশগুলোর একটি ফিনল্যান্ড। বাল্টিক সাগরের উপকূলে এই দেশের অবস্থান। দেশটি টানা ষষ্ঠবারের মতো জাতিসংঘের সুখী দেশের তালিকায় প্রথম হয়েছে। এখানে মানুষের জীবনযাত্রার মান খুবই উন্নত। মোট জনসংখ্যা ৫৭ লাখ। এর মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার, যা ২০১৪ সালে ছিল মাত্র ৬০ হাজার। এক যুগে মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ লাখ। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সাম্প্রতিককালে প্রতি বছর ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা গড়ে প্রায় এক হাজারের ওপর, যাদের মধ্যে মহিলার সংখ্যা বেশি। পরে তারা মুসলমান ছেলেদের বিয়ে করে সংসার পাতেন।
ইবাদত ও আত্মবিশ্লেষণের মাস রমজান। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ফিনল্যান্ডের মুসলমানরাও এই মাসটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। তবে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রমজান পালনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। যেমন গ্রীষ্মকালে সূর্য অস্ত যায় না কিংবা অস্ত গেলেও দিন অনেক লম্বা হয়। শীতকালে সূর্যের স্থায়িত্ব খুবই কম হয় এবং তীব্র ঠা-া থাকে। এসব প্রতিকূলতার মাঝেও ফিনল্যান্ডের মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় অনুশীলন বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন উপায়ে নিজেদের মানিয়ে নেন। এ সমস্যার সমাধান হিসেবে ফিনল্যান্ডের অনেক মুসলমান মক্কার সময় অনুসরণ করেন বা নিকটবর্তী কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সময়সূচি মেনে চলেন।
বিশাল চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ফিনল্যান্ডে রমজান একতা ও আত্মিক চিন্তার মৌসুম হিসেবেই উদযাপিত হয়। দেশের বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার ইফতারের আয়োজন করে, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা একত্র হন। হেলসিঙ্কি ইসলামিক সেন্টারসহ অন্যান্য মসজিদ ও সংগঠনগুলো তারাবির নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত এবং ধর্মীয় আলোচনা সভার আয়োজন করে, যা মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করে তোলে। রমজান মাসে মুসলমানরা দান-সদকার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। জাকাত প্রদান এবং দুস্থদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফিনল্যান্ডে অনেক মুসলিম সংগঠন শরণার্থী ও নিম্নবিত্ত পরিবারদের জন্য খাবার বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা করে।
ফিনল্যান্ডে মুসলিম চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের রোজা রেখে দৈনন্দিন কাজ ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে এমন একটি দেশে যেখানে রমজান সরকারি ছুটির অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে কিছু অফিস ও বিশ্ববিদ্যালয় রোজাদারদের জন্য নমনীয় সময়সীমা বা নামাজের জন্য স্বল্প বিরতির সুযোগ প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মুসলিম শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার আয়োজন করে। সেখানে অমুসলিম শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণ করে। এতে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ফিনল্যান্ডে পড়াশোনা করেন মিসরীয় শিক্ষার্থী আহমদ। এখানে রমজান পালনের বিষয়ে স্থানীয় এক গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘ফিনল্যান্ডে রমজান পালন করা খুবই কঠিন। কারণ এখানে সূর্য প্রায় অস্তই যায় না। তবে ওউলুর মসজিদ থেকে অনুমতি পাওয়া যায় যে, যদি খুব কষ্ট হয় তবে মক্কার সময় অনুসারে রোজা রাখা যাবে। তবে মক্কার সময় অনুসরণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনে খাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। মক্কার সময় অনুযায়ী ফিনল্যান্ডে সাহরির শেষ সময় হয় রাত দুইটার দিকে। কিন্তু তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিন বন্ধ থাকে। আমি কর্র্তৃপক্ষকে বলেছিলাম, যদি মক্কার সময় অনুযায়ী রোজা রাখি, তাহলে অন্তত ক্যানটিন থেকে খাবার নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু সেটা অনুমোদিত হয়নি। তবে সবাই এত কঠোর না, তাই আমি নিজেই আমার জন্য কিছু নিয়ম ঠিক করে নিয়েছি, যাতে আমার সুবিধা হয়।’
সংখ্যালঘু হয়েও ফিনল্যান্ডের মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সম্প্রদায়ের মধ্যে বন্ধন দৃঢ়করণ এবং রমজানের ভাবগাম্ভীর্য অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। মসজিদভিত্তিক ইবাদত, দান-সদকা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে তারা এই পবিত্র মাসের সর্বোচ্চ ফজিলত লাভের চেষ্টা করেন এবং একই সঙ্গে ফিনল্যান্ডের বহুজাতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করেন।