যানজটে নাকাল নগরবাসীর জন্য আসছে নতুন ট্রাফিক সিস্টেম। এ সিস্টেমে সড়কে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় বা দড়ি টানিয়ে সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে না ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের। এতে সড়কে যেমন শৃঙ্খলা ফিরবে তেমনি দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ও নগরবাসী পাবেন স্বস্তি। এরই মধ্যে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলা মোটর, সার্ক ফোয়ারা ও ফার্মগেট মোড়ে আধা-স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নতুন এ উদ্যোগের আওতায় ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৪টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আটটি মোড়ে স্থাপন হবে এসব ট্রাফিক লাইট সিস্টেম। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
নতুন এ প্রকল্পের কার্যকারিতা যাছাইয়ে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল এবং বাংলা মোটরের মোড় ও কারওয়ান বাজারসংলগ্ন সার্ক ফোয়ারা গোলচত্বর ও ফার্মগেট চত্বরে ট্রাফিক লাইটসহ আনুষঙ্গিক স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় বাংলা মোটর মোড়ে সরেজমিন দেখা যায়, সিগন্যাল লাইট স্থাপন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের জন্য খননকাজ করছেন শ্রমিকরা। সেখানে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ আরও দুই জায়গায় কাজ চলছে। এ বিষয়ে গতকাল বিকেলে কথা হয় ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের রমনা এলাকার উপকমিশনার (ট্রাফিক) মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপন করা হবে তাই কেবল সংযোগের জন্য খননের কাজ করছে সিটি করপোরেশন। দুদিকে ছয় ফিট ও এক ফিট করে এ খনন কাজ করা হচ্ছে। সরকার প্রাধান্য দিয়ে এ কাজটি এগিয়ে নিচ্ছে। এটা হলে আমাদের জন্য খুব ভালো হবে।’ এ ট্রাফিক সিস্টেমে কী ধরনের সুবিধা হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট। অনেক অভিযোগ আছে, হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না পুলিশ। সে নিয়ন্ত্রণটাই এখন মেশিনের মাধ্যমে হবে। নতুন এ পদ্ধতির লক্ষ্য হলো, কম লোকবল নিয়ে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে সড়কে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। এটা কার্যকর হবে কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কারণ, ঢাকার পথচারী, চালক, যাত্রীসহ নাগরিক আচরণ পুরনো পদ্ধতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে আমরা আশাবাদী।’
যেমন হবে নতুন এ ট্রাফিক সিস্টেম : জানা গেছে, নির্ধারিত মোড়গুলোতে দোতলাবিশিষ্ট ট্রাফিক পুলিশের বুথ নির্মাণ করা হবে। সেসব বুথে একটি সুইচ থাকবে, যা ব্যবহার করে কর্মকর্তারা স্বয়ংক্রিয় ও ম্যানুয়াল মুড পরিবর্তন করতে পারবেন। কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ক্যামেরা ও লাউডস্পিকারও স্থাপন করা হবে। নতুন এ উদ্যোগের আওতায় থাকবে ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৪টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আটটি মোড় তত্ত্বাবধান করবে। এ সিস্টেম স্থাপন হবে রাজধানীর হাইকোর্টসংলগ্ন কদম ফোয়ারা থেকে উত্তরার আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মকর্তাদের মতে, এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
কতটা কার্যকর হবে এ ব্যবস্থা : পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে না পারলে কোনো সফলতা আসবে না। সেটা যত ইচ্ছা প্রকল্প চালু হোক। শৃঙ্খলা না ফিরিয়ে শুধু ব্যবস্থার নাম পরিবর্তন করে ‘স্বয়ংক্রিয় এবং আধা-স্বয়ংক্রিয়’ যেটাই আনা হোক না কেন, উভয় ব্যবস্থা ব্যর্থই হবে। ট্রাফিক লাইট কাজ করার জন্য ফুটপাতগুলোতে মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে বাস রুট র্যাশনালাইজেশনসহ যত্রতত্র পার্কিং, যাত্রী ওঠানামা এসব করা যাবে না। এগুলো সিগন্যাল কার্যকরের পূর্বশর্ত। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএকে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গুলশান-২, হাতিরঝিল এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মোড়গুলোতে কঠোর আইন প্রয়োগের কারণে সুশৃঙ্খলভাবে যান চলাচল করে। গুলশানে রিকশা, ইজিবাইক বা বাসের অসংলগ্ন চলাচল দেখা যায় না। এজন্য এসব জায়গায় সিগন্যাল কাজ করে।’
এর আগে যত চেষ্টা বিফল হয়েছে : গত ২০ বছরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ১১৯ কোটি টাকারও বেশি খরচ করে প্রধান প্রধান মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল, কাউন্টডাউন টাইমার, ডিজিটাল ডিসপ্লে এমনকি এআই-সমর্থিত সিস্টেম স্থাপন করেছে। আখেরে লাভ হয়নি। ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক লাইটগুলো দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। এরপর ২০১২ ও ২০১৩ সালে ডিএসসিসি সিস্টেমটি পুনরায় চালু করলেও, তা এক মাসের বেশি টেকেনি। একপর্যায়ে পুলিশ লাইটগুলো পরিচালনা করার জন্য রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সেই সিস্টেমটিও ভেঙে পড়ে। দিকনির্দেশনা দেখানো ডিজিটাল ডিসপ্লেগুলো গাড়িচালকদের কাছে অনেকটাই উপেক্ষিত ছিল। গত বছর ৬০ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয়ে গুলশান-২-এ পাইলট প্রকল্প বেসিসে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ এআই-সহায়ক সিস্টেম স্থাপন করলে এটিও বিফলে যায়। এর আগে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসি) পরীক্ষামূলকভাবে চারটি স্থানে এআই-সহায়ক সিস্টেম চালু করেছিল। ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ের সেই ব্যবস্থাও কাজে আসেনি। অন্যান্য মোড়ে, ব্যস্ত সময়ে পুলিশকে ম্যানুয়ালি যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। পরে ডিএসসিসি ৫৪টি মোড়ে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে এবং গত বছর জুলাই মাসে এ উদ্যোগ বাতিল করে।
সার্বিক বিষয়ে অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘প্রশিক্ষিত কর্মী না হলে এবং শৃঙ্খলায় মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলে, ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোও আগের প্রকল্পগুলোর মতো মুখ থুবড়ে পড়বে। পয়সা গচ্চা যাবে। এ ক্ষেত্রে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা একটি মডেল হতে পারে। কারণ ২৫ বছর ধরে ট্রাফিক লাইট কার্যকরভাবে কাজ করছে সেখানে। গাড়ির সংখ্যা রাস্তার জায়গার সঙ্গে সমানুপাতিক হওয়া উচিত। সরকারের উচিত ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানা কমাতে নিরুৎসাহিত করা এবং উন্নত গণপরিবহনে বিনিয়োগ করা।’