ঈদ পোশাক হিসেবে ছেলেদের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে পাঞ্জাবি। সারা বছর নানা ধরনের কাপড় কিনলেও ঈদের পোশাক হিসেবে পাঞ্জাবির উপস্থিতি থাকে সবার কেনাকাটায়। আর তাই ব্র্যান্ড ও নন-ব্যান্ড শপ এবং ডিজাইনাররা পাঞ্জাবির নকশা, রঙ আর কাপড়ের ধরনের ব্যাপারে অনেক বেশি মনোযোগী। ঈদের পাঞ্জাবির হালচাল জানালেন মোহসীনা লাইজু
দেশের সবচেয়ে বড় এই উৎসবের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে রঙ বাংলাদেশ প্রতিবারের মতো এবারও থিম-ভিত্তিক কালেশনের দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। এবারের থিম ‘আল হামরা মসজিদ’, ‘টি’নালক উইভিং’ ও ‘ডিলাইট ইন ডিজাইন-ইন্ডিয়ান সিলভার ফর দ্য রাজ’, থিমগুলো নিয়ে একটু ব্যাখ্যা দিলেই এই প্রতিষ্ঠানটির বৈচিত্র্যময় নকশার ধারণা যে কতটা সমৃদ্ধ স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
আল হামরা মসজিদ স্পেনের কর্ডোবা শহরে অবস্থিত উমাইয়া খলিফাদের নির্মিত ঐতিহাসিক স্থাপত্য। ৭৮৪ সালে নির্মিত এই মসজিদটি ইসলামি স্থাপত্যশৈলীর অসাধারণ নিদর্শন। মসজিদের অনন্য শিল্পশৈলীম-িত নকশার অনুপ্রেরণাকে রঙ বাংলাদেশ ঈদ পোশাকে তুলে ধরেছেন। রঙ বাংলাদেশ সেই শিল্প অনুপ্রেরণার ছাপ রেখেছে নিজস্ব ঈদ পোশাকের কালেকশনে।
‘ডিলাইট ইন ডিজাইন-ইন্ডিয়ান সিলভার ফর দ্য রাজ’ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ভারতীয় কারিগরদের তৈরি রূপার শিল্পকর্ম। এটি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী মোটিফ এবং ব্রিটিশ নকশার সমন্বয়ে তৈরি, যা রাজপরিবার ও ঔপনিবেশিক অভিজাতদের জন্য ব্যবহৃত হতো। এই ব্যবহার্য শিল্পকর্মে আছে সূক্ষ্ম খোদাই, জটিল নকশা এবং কারিগরদের সৃজনশীলতার ছাপ। ভারতীয় এবং ব্রিটিশ সংস্কৃতির মেলবন্ধনের এই শিল্পধারা থেকেও রঙ বাংলাদেশ তাদের ঈদসামগ্রী তৈরিতে প্রেরণা নিয়েছে।
ঈদে বড়দের চেয়ে ছোটদের আগ্রহ যেহেতু কম নয়, তাই বড়দের সঙ্গে সঙ্গে ছোটদের আয়োজনেও সমান গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে আকর্ষণীয় পোশাক। পরিবারের সবাই একই ডিজাইন বা থিমের পোশাক পরে উদযাপন করতে পারবে এবারের ঈদ উৎসব। ছেলেদের পোশাকে আছে পাঞ্জাবি, পায়জামা, কাতুয়া, কাবলি সেট, শার্ট, টি-শার্ট, পোলো টি-শার্ট ইত্যাদি ।
ঈদের পাঞ্জাবির বিশাল সংগ্রহ নিয়ে হাজির হয়েছে কে ক্র্যাফটে। তাদের পাঞ্জাবিতে রঙ নকশা ও ফেব্রিকসে বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। একরঙা কাপড়ের ওপর গলায় ও হাতায় অল্প নকশা করা পাঞ্জাবির পাশাপাশি বুননে সেলফ মোটিফও স্থান পেয়েছে । কে ক্র্যাফটের উদ্যোক্তা খালিদ মাহমুদ খান জানান, কে ক্র্যাফটের পাঞ্জাবির নকশায় এবার ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন কারুকাজ ও অলংকরণ বেশি দেখা যাবে। ব্যবহার করা হয়েছে পিওর কটন, ব্লেন্ডেড কটন, ভিসকস, টু-টোন কটন, জ্যাকার্ড ফেব্রিক। অ্যাপ্লিক, কাটওয়ার্ক, কাঁথা স্টিচ, লে আউট প্রিন্টও দেখা যাবে। বয়স ও রুচির ভিন্নতার কথা মাথায় রেখেই এসব নকশা করা হয়েছে। তাদের আয়োজনে সকালে নামাজে যাওয়ার জন্য যেমন আছে সুতির হাল্কা নকশার পাঞ্জাবি। তেমনি রাতে পরার জন্য একটু ভারী নকশার গাঢ় রঙের পাঞ্জাবি।
পাঞ্জাবির নকশায় গত বছর থেকে এ বছর একটু বেশি আধিক্য দেখা যাচ্ছে। ছোট ছোট ফুল, বুকের দিকে হালকা কাজ। একটু ঢোলা কাটের পায়জামাই চলছে। এক রঙের পণ্য বেশি, তবে ছাপা নকশার পাঞ্জাবিও চলছে। উপকরণ হিসেবে থাকছে সুতি, ভিসকস ইত্যাদি। দেশীয় ব্র্যান্ড শপগুলোতে এক রঙের কাপড়ে হাতা ও গলায় কাজ করা পাঞ্জাবির সংখ্যা বেশি। সাদা কাপড়ে সাদা সুতায় নকশা করা পাঞ্জাবিও আছে। এক রঙের কাপড়ে হাত ও গলায় হাল্কা নকশার পাঞ্জাবির প্রতি ক্রেতার আগ্রহ বেশি এমনটাই জানালেন শতাব্দীর ডিজাইনার রুশো হিমেল। গরমের কারণে এবার সুতি কাপড়ে তৈরি পাঞ্জাবির সংগ্রহ বেশি। তবে হাফসিল্ক, ব্লেন্ডেড সিল্ক, মেশানো সুতি, জর্জেটের পাঞ্জাবিও মিলবে। এবার জামদানি ও ফুলের নকশায় অনুপ্রাণিত সংগ্রহ ক্রেতাদের নজর কাড়বে বলে আশা করছেন ডিজাইনাররা। পাঞ্জাবির সঙ্গে মিলিয়ে অনেকে কিনছেন কোটিও। বাবার সঙ্গে মিল রেখে একই রকম পাঞ্জাবি কিনতে পারবে ছেলেও। গলায় ও হাতার বোতামে এবার বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।
ফ্যাশন ব্র্যান্ড অঞ্জন’স-এর প্রধান নির্বাহী শাহীন আহমেদ বলেন, ‘আগের থেকে এখন ফিটিং পাঞ্জাবি বেশি চলছে। তবে সেটা আঁটসাঁট নয়। পাঞ্জাবির দৈর্ঘ্য কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া আমরা ব্যান্ড কলারই ব্যবহার করেছি। পাঞ্জাবির হাতা ও গলায় এমব্রয়ডারির কাজ এবার বেড়েছে।’
ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘জেন্টল পার্কের’ সিনিয়র ডিজাইনার শফিক রেহমান বলেন, ‘এবার যেহেতু ঈদ গরমে, তাই আরামদায়ক কাপড়ে হাল্কা কাজকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পাঞ্জাবির গলায় ও কাফে এমব্রয়ডারি নকশা করা হয়েছে। পুরো পাঞ্জাবিতে কাজ করা থাকলেও সেখানেও ছোট ছোট নকশাই প্রাধান্য পেয়েছে।’
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সিল্ক, লিলেন, রেমি কটন, ফাইন কটন, কটনের পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি। গত বছরের মতো এবারও ডিজিটাল প্রিন্টের পাঞ্জাবি চাহিদা রয়েছে। পাঞ্জাবির সামনে এমব্রয়ডারি, সুই-সুতার ভারী কাজের দেখা মিলছে বেশি। তা ছাড়া এবার জমকালো কাজের পাঞ্জাবিও রয়েছে অনেক। পাঞ্জাবির সামনের অংশটায় ভরাট কাজ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আলাদা করে কটি ডিজাইনের পাশাপাশি পাঞ্জাবির সঙ্গে সমন্বয় করে পাঞ্জাবি ও কটি সেট তৈরি করা হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে অনেক ছেলেদের কাছে কাবলি সেট বেশ জনপ্রিয়। কাবলি সেটে এবার তেমন পরিবর্তন আসেনি। চাইলে গাঢ রঙ যেমন বোটল গ্রিন, মাস্টার্ড ইয়ালো, নেভি ব্লু, মেরুন কাবলি সেট ঈদের স্টাইল করতে পারেন। সিল্কের ওপর ভারী কাজের এমব্রয়ডারি বা ঘন হাতের কাজের পাঞ্জাবি রাতের দাওয়াতের জন্য বেছে নিতে পারেন। পাঞ্জাবিতে এবার জারদৌসি, চুমকি, কারচুপি, লখনৌ স্টিচের কাজ দেখা যাচ্ছে। এক রঙের পাঞ্জাবির ওপর কনট্রাস্ট সুতার কাজ প্রাধান্য পেয়েছে।’
ফ্যাশন হাউজ ভারমিলিয়নের ডিজাইনার ফেরদৌসী আরা বলেন, ‘চেষ্টা থাকে প্রতি উৎসব-পার্বণে ম্যাচিং করে নারী-পুরুষের পোশাক ডিজাইনের। এবার যেহেতু ঈদ ও পহেলা বৈশাখ কাছাকাছি সময়ে তাই হাল্কা রঙের পাশাপাশি রঙিন ও উজ্জ্বল রঙও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।’ ঈদের সকালে পরতে পারেন হাল্কা রঙের পাঞ্জাবি। সাদা, অফ হোয়াইট, আকাশি, হাল্কা বেগুনি, পাউডার পিংকের মতো হাল্কা রঙগুলো সকালে স্নিগ্ধতা ছড়াবে। রাতের পাঞ্জাবি হোক গাঢ় রঙের। নির্বাচন করতে পারেন ভারী কাজের পাঞ্জাবি।
এ তো গেল ডিজাইনার পাঞ্জাবির কথা। চাইলে নিজের পছন্দমতো ফেব্রিক আর ডিজাইন দিয়ে বানিয়েও নিতে পারেন পাঞ্জাবি। অনেক সময় দেখা যায় ফেব্রিক পছন্দ হলেও ডিজাইন পছন্দ হয় না, আবার ডিজাইন পছন্দ হলে ফেব্রিক পছন্দ হয় না। যারা শৌখিন আর নিজেদের একদমই আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে চান, তারা পছন্দমাফিক ফেব্রিক দিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন পছন্দের পাঞ্জাবিটি। ঢাকা কলেজের বিপরীতে সিটি টেলার্সের পাঞ্জাবি কারিগর ইয়াসিন মুন্সী বলেন, অনেকেই আছেন পছন্দসই কাপড় দিয়ে পাঞ্জাবি বানিয়ে পরেন। এ ধরনের পাঞ্জাবির সুবিধা হলো শরীরের সঙ্গে ভালোভাবে ফিটিং হয়। আবার আনকমন ও হয়। দেশি-বিদেশি উন্নতমানের কাপড়ের ওপর এমব্রয়ডারি, কারচুপি, জারদৌসি কাজ করিয়ে আমাদের কাছ থেকে পাঞ্জাবি বানিয়ে নেন অনেকে।
দরদাম
নন-ব্র্যান্ডের নকশা করা পাঞ্জাবির দাম ১ থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে। আর ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবি পাবেন দেড় থেকে বারো হাজার টাকার মধ্যে। রঙ বালাদেশের পাঞ্জাবি পাবেন ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে। সেইলরের পাঞ্জাবি পাবেন ২ হাজার ৭৫০ থেকে প্রায় ৮ হাজার টাকায়। ১ হাজার ৬০০ থেকে ৬ হাজার টাকার ভেতরে পাঞ্জাবি পাওয়া যাবে লা রিভ-এ। আড়ংয়ের সুতির পাঞ্জাবি পাবেন ১ হাজার ২০০ থেকে ১৮ হাজার টাকা । ইলিয়েনের পাঞ্জাবির দাম ৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা। টুয়েলভ ক্লদিং পাঞ্জাবির দাম রেখেছে ১ হাজার ৪৯০ থেকে ১৩ হাজার টাকার মধ্যে। ৩ থেকে ৮ হাজার টাকায় এক্সট্যাসির ঈদের পাঞ্জাবি কেনা যাবে।