দুর্বল হলেও প্রতিরোধে সক্ষম হামাস

দীর্ঘ ১৫ মাসের সংঘাত শেষে চলতি বছর জানুয়ারির শেষে গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল হামাস ও ইসরায়েল। তবে তিন ধাপের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শেষে, গত সপ্তাহ থেকে আবারও গাজায় নতুন করে হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। তাদের অব্যাহত বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন ছয় শতাধিকের বেশি ফিলিস্তিনি। যার মধ্যে রয়েছেন গাজা সরকারের প্রধানসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাও। আহত হয়েছেন আরও প্রায় বারোশ মানুষ। তেল আবিবের দাবি, হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের জন্য হামলা চালানো হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের তীব্র অভিযান সত্ত্বেও  ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলের জন্য এখনো শক্তিশালী এক প্রতিপক্ষ। এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রতিবারই নিজেদের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে হামাস। গত অক্টোবরে হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর নতুন কাউকে বাছাই করার পরিবর্তে পরিষদের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় গোষ্ঠীটি। এতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি হামলার শিকার হওয়া এবং একক ব্যক্তিনির্ভরতা হ্রাস পাবে বলে আশা করছে তারা। এ ছাড়া ইসরায়েলে হামলার জন্য রকেট ব্যবহারের বদলে আবারও গেরিলা কায়দায় হামলার দিকে মনোযোগ বৃদ্ধি করছে তারা। এমনকি, ইসরায়েলি নজরদারি এড়াতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রের বদলে মানুষের মাধ্যমে বার্তা আদান প্রদান করা হচ্ছে। হামাস ও ইসরায়েলের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে রয়টার্স। ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সক্ষমতা ও কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আলাপ করেছে বার্তা সংস্থাটি। ইসরায়েলের জন্য হামাসের ঝুঁকির বিষয়ে সবাই একবাক্যে বলেছেন, ক্রমাগত আক্রমণে অনেকটাই দুর্বল হলেও, হামাস এখনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। হামাসকে একেবারে নির্মূল করা কখনোই সম্ভব না। উপরন্তু ইসরায়েলের আগ্রাসনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সংগঠনটি ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে।

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠানের (ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ) গবেষক কোবি মাইকেল সতর্ক করে বলেছেন, হামাস এখনো টিকে আছে। তারা গাজায় এখনো শাসন করে যাচ্ছে এবং দল পুনর্গঠনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করে পাল্টা আক্রমণ ও গাজা পরিচালনার সক্ষমতা দেখে গেছে হামাসের মধ্যে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বরাবর বলে আসছেন, হামাসের সামরিক শক্তি নিশ্চিহ্ন এবং শাসনক্ষমতা ধ্বংস করা তাদের একমাত্র লক্ষ্য। সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে তিনি বলেছেন, এসব হামলার মাধ্যমে হামাসের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, যাতে তাদের কাছে বন্দি থাকা জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়। সামনের দিনগুলোতে আরও বৃহৎ সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তেল আবিবের বিভিন্ন বক্তব্যে। মঙ্গলবার ইসরায়েলি হামলায় হামাসের কার্যত সরকার প্রধান (ডি ফ্যাক্টো গভর্নমেন্ট হেড) এসসাম আদ্দালীইস এবং নিরাপত্তা প্রধান মাহমুদ আবু ওয়াতফা নিহত হয়েছেন। এভাবে গোষ্ঠীটির সামরিক ও রাজনৈতিক শাখার হাজারো সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, এই সহিংসতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেলে আবার যুদ্ধ শুরু হবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাব্য সেই সংঘর্ষের সময়সীমা এবং যুদ্ধপরবর্তী গাজার অবস্থা নির্ভর করবে ইসরায়েলি হামলা সহ্য করে হামাসের টিকে থাকার ক্ষমতার ওপর।

এর আগে, গত বছর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান মুখপাত্র দানিয়েল হ্যাগারি বলেছিলেন, হামাসকে নির্মূল করার যে লক্ষ্য নিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। দেশটির টেলিভিশন চ্যানেল থার্টিন নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, হামাসকে ধ্বংস করা বা নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা- এক কথায় বলতে গেলে তা জনগণের চোখে ধুলো দেওয়ার মতো। তার ভাষ্য, হামাস একটি আদর্শ। হামাস একটি দল। তাদের অবস্থান জনগণের হৃদয়ে। যারাই মনে করেন আমরা হামাসকে নির্মূল করতে পারি তারা ভুল করছেন। তারও আগে, ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে পুরোপুরি হারানো সম্ভব নয় বলে স্বীকার করেছিলেন ইসরাইলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার দপ্তরবিহীন মন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকোট।

এদিকে, ইসরায়েলের  সামরিক বাহিনীকে গাজা উপত্যকায় আরও এলাকা দখল করে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি হুমকি দেন, হামাস যদি বাকি জিম্মিদের মুক্ত না করে, তবে গাজার কিছু অংশ স্থায়ীভাবে দখল করে নেওয়া হবে।