জাকাত ইসলামের অন্যতম মূল স্তম্ভ। পবিত্র কোরআনের ৩২ স্থানে জাকাত শব্দের উল্লেখ রয়েছে, যা নামাজের পর কোরআনে ব্যবহৃত সর্বাধিক শব্দ। কোরআন-হাদিসে জাকাতের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা এবং এর সুফল ও উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য তাতে অশেষ সওয়াব, রহমত ও মাগফিরাতের পাশাপাশি সম্পদের পবিত্রতা এবং আত্মশুদ্ধিও রয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য আগে প্রেরণ করবে তা আল্লাহর কাছে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা বাকারা ১১০) অপর আয়াতে জাকাতের গুরুত্বপূর্ণ সুফল বর্ণনা করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার দ্বারা আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশোধিত করবেন। আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন। আপনার দোয়া তো তাদের জন্য চিত্ত স্বস্তিকর। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।’ (সুরা তওবা ১০৩)
কোরআনের যেখানে খাঁটি মুমিনের গুণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লিখিত হয়েছে সেখানে নামাজ ও জাকাতের কথা এসেছে। এত অধিক গুরুত্বের সঙ্গে নামাজ ও জাকাতের প্রসঙ্গ কোরআনে এসেছে যে, এটা ছাড়া দ্বীন ও ইমানের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না। যারা জাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও আদায় করে না, তারা জাকাতের সব সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর আদেশ অমান্য করার কারণে শাস্তির মুখোমুখি হবে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যা তোমাদের দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তারা যেন কিছুতেই মনে না করে যে, এটা তাদের জন্য মঙ্গল। না, এটা তাদের জন্য অমঙ্গল। যে সম্পদে তারা কৃপণতা করেছে কেয়ামতের দিন সেই সম্পদ তাদের গলায় বেড়ি হবে। আসমান ও জামিনের স্বত্বাধিকার একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যা করো আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবগত।’ (সুরা আলে ইমরান ১৮০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু সে সেটার জাকাত দেয়নি, কেয়ামতের দিন তা বিষধর সাপ রূপে উপস্থিত হবে এবং তা তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার মুখের উভয় পার্শ্বে দংশন করবে এবং বলবে, আমিই তোমার ওই ধন, আমিই তোমার পুঞ্জীভূত সম্পদ।’ (সহিহ বুখারি ১৪০৩)
ইসলাম সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। এ ধর্ম মানুষকে পরোপকারী বানায়। অন্যের ব্যথায় সমব্যথী করে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হতে তাগিদ দেয়। ইসলাম চায় ধনী-গরিবের বৈষম্য ঘুচে যাক। তাদের মধ্যে কোনো তারতম্য না থাকুক। ধনী-গরিবের দূরত্বকে কমানোর জন্য এবং বিত্তশালীদের সম্পদের পবিত্রতার জন্য ইসলাম নিয়ে এসেছে জাকাতের বিধান। বিত্তশালীরা হতদরিদ্র ও জাকাতের উপযুক্তদের জাকাত দিয়ে তাদের সম্পদের হক আদায় করবে। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ হুকুম পালন করবে। আর দরিদ্ররা তাদের প্রাপ্য অধিকার পেয়ে যাবে, এটাই ইসলাম বলে।
জাকাতদাতা গরিব ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো জাগতিক স্বার্থ রাখতে পারবে না। জাকাত আদায়কালে আদায়কারীর উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। এর বিপরীত হলে তা আমল হিসেবে বিবেচিত হবে না। এ ধরনের যেকোনো প্রয়াসে জাকাত আদায় হবে না। রাসুল (সা.) রিয়া বা লোক দেখানো আমল থেকে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। এটাকে আখ্যায়িত করেছেন ছোট শিরক বলে। তিনি বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে ছোট শিরক নিয়ে যতটা ভয় পাচ্ছি, অন্য কোনো ব্যাপারে এতটা ভীত নই।’ (মুসনাদে আহমাদ ২২৫২৮)
জাকাত আদায়কারী ব্যক্তি গরিবকে জাকাত প্রদান করে তার ওপর কোনো অনুগ্রহ করছেন এমন ভাবলেও তা অন্যায় বলে বিবেচিত হবে। কারণ সম্পদের ওই নির্দিষ্ট অংশ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া গরিবের হক। তা গরিবের অধিকার। ধনীরা জাকাত আদায় করা মানে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা। গরিবের ওপর অনুগ্রহ করা নয়। কেননা কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের (ধনীদের) সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার।’ (সুরা জারিয়াত ১৯) সুতরাং আপনি এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন যে, দরিদ্রদের সাহায্য করছেন, বরং আপনি জাকাত আদায়ের মাধ্যমে আপনার সম্পদের হক আদায় করছেন।
ইসলাম ধনীদের সম্পত্তির বর্ধিত অংশকে গরিবের পাওনা বা হক হিসেবে দেখে। যে কারণে জাকাত গরিব, মিসকিন ও বঞ্চিতদের হক। সেটি আপনি আমি কখনই আত্মসাৎ করতে পারি না। আমাকে আপনাকে আল্লাহ সম্পদশালী করেছেন তার মানে এই নয় যে, সেই সম্পদে কারও হক নেই। বরং ইসলামি বিধিবিধান অনুসারে ধনীদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ সম্পদ গরিব ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশনা রয়েছে। জাকাত সম্পদের শতকরা আড়াই শতাংশ হিসাবে আল্লাহর নির্ধারিত খাতে বণ্টন করতে হয়। অথচ আমরা গরিব-মিসকিন ও অসহায় মানুষদের দান করতে অনেক সময় কার্পণ্য করি। মনে রাখবেন জাকাত আদায় করার মাধ্যমে সম্পদ কমে না বরং আরও বাড়ে। তাতে বরকত হয়। জাকাত আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। ভাব-মর্যাদা অক্ষুণœ থাকে এবং আত্মমর্যাদা ও সম্মানবোধ বৃদ্ধি পায়।
খুলাফায়ে রাশেদিন ও তার পরবর্তী সময়ে সঠিকভাবে জাকাত আদায়ের ফলে মুসলিম বিশ্বে জাকাত নেওয়ার মতো লোক পাওয়া বেশ দুরূহ হয়ে পড়েছিল। এটা হলো জাকাতের সুফল, যা সমাজে শান্তি নিয়ে আসে আর দারিদ্র্য বিমোচন করে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে।