আসন্ন ঈদুল ফিতর সামনে রেখে আজ সোমবার থেকে ঢাকা ছাড়তে শুরু করবে রাজধানীর বাসিন্দারা। এরই মধ্যে ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি প্রায় শেষের দিকে। তবে ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে গত বছরগুলোর মতো এবারও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ রুটের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসগুলোয় গত মাসের তুলনায় ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের ঈদে ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাবে। দেশের এক জেলা থেকে অপর জেলায় আরও ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি মানুষের যাতায়াত হতে পারে; যার ৭৫ শতাংশ সড়কপথে, ১৭ শতাংশ নৌপথে এবং ৮ শতাংশ রেলপথে হবে। সেই হিসাবে বেশিরভাগ যাত্রী যাতায়াত করবে বাসে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ না করে দেওয়ায় ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছেন বাসমালিকরা।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্র্মী রেজওয়ান আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক মাস আগেও ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় আলহামরা পরিবহনের এসি বাসে ৮০০ টাকায় যাওয়া যেত। সেই ভাড়া এখন ১৬০০ টাকা। আর ১০০০ টাকা (ভাড়া) যেটি ছিল সেটি এখন ২০০০ টাকা হয়ে গেছে। বিআরটিএ থেকে ভাড়া নির্ধারণ না করায় বাসমালিকরা এসি বাসের টিকিটের গায়ে বাড়তি টাকা লিখেই বিক্রি করছেন। আমি দুটি টিকিট কিনেছি ২৫ তারিখে (মার্চ) যাওয়ার জন্য। আগে যেটি ৮০০ ছিল সেটি এখন ৩২০০ টাকা দিয়ে।’
২৯ মার্চ ঢাকা থেকে বাগেরহাট যাওয়ার জন্য সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে টিকিট কেটেছেন মো. রুমান। তিনি তিনি বলেন, ‘ফ্লাগুনী পরিবহনের এসি বাসে আগে ৮০০ টাকায় যাওয়া গেলেও ১২০০ টাকা দিয়ে ঈদযাত্রার টিকিট কিনতে হয়েছে।’
আগামী ২৭ মার্চ ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবেন ফয়সাল আহমেদ। তিনি হানিফ এন্টারপ্রাইজের বিজনেস ক্লাস বাসের প্রতি আসনের টিকিট সংগ্রহ করেছেন ১৮০০ টাকা করে। ফয়সাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একই (পরিবহনের) বাসে আমি আগে রাজশাহী ১১০০ টাকা দিয়ে গিয়েছি। কিন্তু ঈদের জন্য এখন এসি বাসের ভাড়া ইচ্ছামতো আদায় করছে।’
এদিকে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধের দাবি জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদকে কেন্দ্র করে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে বিভিন্ন পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও প্রকাশ্যে বিভিন্ন শ্রেণির বাস ও লঞ্চে নানা কায়দায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে যাত্রী প্রতিনিধি ছাড়া শুধু বাস ও লঞ্চের মালিকদের নিয়ে স্বৈরাচারী কায়দায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় মনিটরিংয়ের জন্য ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবারের ঈদে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটে এসি ও নন-এসি বাসে ৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের বাসে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। আর এসি বাসের ভাড়া সব জায়গায় আগের থেকে ডাবল নিচ্ছে। এত বছর হয়ে গেল এখনো বিআরটিএ এই ভাড়া নির্ধারণ করতে পারেনি।’ দ্রুত এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ এবং ঈদযাত্রায় সবপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ ও যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামলী এনআর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নন-এসি বাসের ভাড়া বিআরটিএ থেকে যেটি কার্যকর করা থাকে সেটি রাখা হয়। অনেক সময় সে ভাড়া থেকেও কম রাখা হয়। তবে বিআরটিএ এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়নি। এসি বাস হচ্ছে বিলাসবহুল সেবা। এর ভাড়া বিআরটিএ নির্ধারণ করতে পারেনি বলে ভাড়া নিয়ে কিছু জটিলতা আছে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুম বলেন, ‘সমিতির পক্ষ থেকে বাস মালিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। সেখানে কেউ যেন অতিরিক্ত ভাড়া না নেয়, সে বিষয়ে বলা হয়েছে। এখন এসি বাসের ভাড়া বিআরটিএ থেকে এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। বিআরটিএ যদি ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে সে ভাড়া রাখা হবে।’
সার্বিক বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মো. ইয়াসীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাড়ানৈরাজ্য ঠেকাতে আমাদের কাজ চলমান আছে। প্রতিনিয়ত মনিটরিং করা হচ্ছে বাস টার্মিনালগুলোয়। এখন এসি বাসের বিষয়টি বলছেন, সেটি খোঁজ নিয়ে দেখছি।’