ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকমী সংগঠন হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর গাজা উপত্যকায় আগ্রাসন চালিয়ে আসছে তেল আবিব। দীর্ঘ ১৫ মাসের যুদ্ধের পর মিসর-কাতার-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় হামাস ও ইসরায়েল। তবে তিন ধাপের প্রস্তাবিত সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি প্রথম ধাপের পরই ভেস্তে যায়। এরপর থেকে আবারও গাজায় আকাশ ও স্থলপথে বিস্তৃত অভিযান শুরু করে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৮ মার্চ ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত ভেঙে হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন কয়েক শতাধিক। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে প্রতিদিনই মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ১১২ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এরমধ্যে গাজা শহরের তিনটি আলাদা স্কুলে আশ্রয় নেওয়া নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও গাজা সিটিতেই প্রাণ গেছে ৭১ জনের। পাশাপাশি গাজার দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলার জেরে গাজার হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ও আশ্রয় শিবির ছেড়ে পালাচ্ছেন। এতে গাজায় আবার বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গাজাবাসীরা আশঙ্কা করছেন, ইসরায়েলের প্রকৃত উদ্দেশ্য গাজার উত্তর ও দক্ষিণের এলাকাগুলো স্থায়ীভাবে জনশূন্য করে ফেলা। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার দক্ষিণের শেষ আশ্রয়স্থল রাফাহ শহরে প্রবেশ করে নতুন ঘোষিত নিরাপত্তা অঞ্চল দখল শুরু করেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, সেনারা মোরাগ অক্ষ নামে একটি এলাকা দখল করেছে। যা রাফাহ ও খান ইউনিসের মধ্যবর্তী একটি পরিত্যক্ত ইসরায়েলি বসতি ছিল। ঘরবাড়ি ও আশ্রয় শিবির থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার গাজাবাসীর শেষ আশ্রয়স্থল ছিল রাফাহ।
স্থানীয় একটি হাসপাতালকে উদ্ধৃত করে হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজা সিটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় তুফাহ জেলার দার আল-আরকাম স্কুলে ওই হামলায় ৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। হামলায় নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু ও নারী বলে নিশ্চিত করেছে গাজার হামাস পরিচালিত বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল। ইসরায়েলের দাবি, তারা ওই শহরে হামাসের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে থাকা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজা শহরের যে স্থানে হামলা চালানো হয়েছে, সেটিকে হামাস যোদ্ধারা ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক ও সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করতে ব্যবহার করছিল। যদিও নিজেদের এই দাবির পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেয়নি তেল আবিব।
ইসরায়েলের এই গণহত্যা বন্ধে এখনই বিশ্বকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে গাজার জরুরি উদ্ধারকারী সংস্থা। সংস্থাটির এক মুখপাত্র আল-জাজিরাকে বলেন, এখানে যা হচ্ছে সেটি বিশ্ববাসীর জন্য জেগে ওঠার একটি ডাক। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ এবং এই গণহত্যা এখনই বন্ধ হওয়া উচিত। শিশুরা এখানে ঠা-া মাথায় হত্যার শিকার হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে এখনই বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে, যেন তারা আর কোনো নারী, শিশু এবং বৃদ্ধকে হত্যা করতে না পারে। তিনি বলেন, এটি শুধুমাত্রই একটি গণহত্যা নয়। এটি ইসরায়েলের উন্মত্ততা। তারা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা নারী ও শিশুদের হত্যার জন্য পাগল। দার আল-আরকাম স্কুলে ইসরায়েলি বাহিনী সরাসরি হামলা চালিয়েছে।
ভয়াবহ এ হামলায় আহত হওয়া শতাধিক মানুষকে আল আহলি-আরব হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বুলডোজার দিয়ে তুলকারেমের বিভিন্ন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনারা। অভিযান চলছে পশ্চিম তীরেও। তুফাহতে হামলার আগে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, একই সময়ে অন্তত ১ হাজার ১৬৩ জন নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের একটি সংস্থা জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৩০০ জনের বেশি শিশু রয়েছে। সম্প্রতি গাজা উপত্যকা থেকে ১৫ জন স্বাস্থ্যকর্মীর মরদেহ উদ্ধার হয়। তাদের মাথায় ও বুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারীরা।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক গাজায় অ্যাম্বুলেন্সে গুলি চালিয়ে চিকিৎসক ও মানবিক কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এই হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ফলকার তুর্ক বলেছেন, সম্প্রতি ১৫ জন চিকিৎসাকর্মী এবং মানবিক সহায়তা কর্মীর হত্যাকাণ্ডে আমি মর্মাহত, যা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের ঘটনা নিয়ে আরও উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। গত ২৩ মার্চের ঘটনাটির স্বাধীন, দ্রুত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রাফার কাছে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের আটজন এবং জাতিসংঘের একজনসহ ১৫ জন উদ্ধারকারী এবং মানবিককর্মীর মৃতদেহ পাওয়া গেছে। যাকে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় অফিস (ওসিএইচএ) গণকবর বলে অভিহিত করেছে। এর আগে মঙ্গলবার ওসিএইচএ জানিয়েছিল যে, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে প্রথম দলটি নিহত হয় এবং অন্যান্য জরুরি ও সাহায্যকারী দলগুলো তাদের নিখোঁজ সহকর্মীদের সন্ধানে গেলে কয়েক ঘণ্টা ধরে একের পর এক হামলার শিকার হয়।
একই অভিমত দিয়েছেন ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সভাপতি ইউনূস আল-খতিব। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সামনে তিনি বলেন, এই সংঘাতের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তগুলোর মধ্যে একটি যা আমাদের মানবতাকে তার মূলে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, গাজায় নিহতদের আত্মারা এই অন্যায়ের ন্যায়বিচার চাচ্ছে। জাতিসংঘে সেøাভেনিয়ার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল জবোগার গাজার পরিস্থিতিকে মানবতার ক্ষয় বলে অভিহিত করেছেন। মানবিক কর্মীদের ওপর বারবার হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করতে পারি না যে এগুলো কেবল ভুল ছিল।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা গত ২৩ মার্চ, ২০২৫ সালের ঘটনা তদন্ত করছে এবং দাবি করেছে যে তাদের সৈন্যরা সন্ত্রাসীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল। জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বেসামরিক কর্মীদের সুরক্ষার জন্য মানবিক সংস্থাগুলোর একটি উন্নত পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
গাজাবাসীরা বলছেন, ইসরায়েল গাজার শেষ কৃষিজমি ও পানির অবকাঠামো দখল করতে চাচ্ছে। গত মার্চ থেকে ইসরায়েল গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দার জন্য সব ধরনের পণ্য প্রবেশে অবরোধ জারি করেছে, যা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে মানবিক বিপর্যয় বলে অভিহিত করতে বাধ্য করছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা উপত্যকার ৮৫ শতাংশ মানুষ মৌলিক খাদ্য সংকটে রয়েছে। ৩৪টি হাসপাতাল ও ৮০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উপত্যকা জুড়ে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা।
এদিকে, দক্ষিণ লেবাননে হামাসের শীর্ষস্থানীয় এক নেতাকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। সিদন অঞ্চলে পরিচালিত ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কমান্ডার হাসান ফারহাতের নিহত হওয়ার খবরটি শুক্রবার নিশ্চিত করেছে আইডিএফ। এক বিবৃতিতে আইডিএফ জানায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনায় জড়িত ছিলেন ফারহাত। ইসরায়েল ও তার জনগণের জন্য তার কর্মকাণ্ড হুমকি সৃষ্টি করেছিল। আইডিএফ-এর দাবি, গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের বেসামরিক ও সামরিক নাগরিকদের ওপর একাধিক হামলা চালানোতে জড়িত ছিলেন ফারহাত। তার আদেশে গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি উত্তরাঞ্চলীয় সাফেদ কমান্ড বেইজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালিত হয়। ওই হামলায় স্টাফ সার্জেন্ট ওমের সারাহ বেনজো নিহত এবং একাধিক সেনা আহত হন। সিদনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে ইসরায়েলি হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে লেবানিজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কর্র্তৃপক্ষ বলেছে, ওই হামলায় তিন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম অভিযোগ করেছেন, এই হামলা করে যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে তেল আবিব।