স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আইনে পরিচালিত হয় ঢাকা ও চট্টগ্রাম ওয়াসা। উভয় সংস্থায় আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগ দেওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চাকরি থেকে অপসারণও করা হয়েছিল একই আইনে নতুন ধারা সংযোজন করে। কিন্তু এখন নতুনভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ বিজ্ঞাপনে দুই সংস্থা দুই ধরনের শর্ত আরোপ করেছে। আর এতে দাবি উঠেছে পক্ষপাতিত্ব কিংবা কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগে নিয়োগের শর্তে বৈপরীত্যের।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি সংস্থা কাজ করে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে পাশাপাশি দিনে। কিন্তু একটিতে শুধু প্রকৌশলীরা এবং অপরটিতে প্রকৌশলী ও সাধারণ প্রশাসনের চাকুরি করা ব্যক্তিরাও আবেদন করতে পারবেন। একইভাবে বয়সের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। দুই সংস্থায় দুই রকম কেন হবে? সব যোগ্যতা ও শর্তাবলি একই রকম হওয়ার কথা।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাহলে কি কাউকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি?’
মনজারে খোরশেদ আলমের বক্তব্যের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের কমিটির সদস্য স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যে শুধু প্রকৌশলীরাই থাকতে পারবেন তা কিন্তু নয়। প্রশাসন ক্যাডারেও যোগ্য প্রার্থী থাকতে পারে। একইসঙ্গে প্রকৌশল দিক পরিচালনার জন্য তো প্রকৌশল টিম রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমার কাছে এটাকে তেমন বৈপরীত্য মনে হয়নি। তবে এটা ঠিক যে দুই সংস্থায় একই যোগ্যতা ও শর্তে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল।’
একই মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা। তিনি বলেন, ‘দুই সংস্থা একই রকম হলে ভালো হতো। তবে প্রশাসনেও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী রয়েছে এবং এতে বাছাই করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
তবে দুই সংস্থায় একই যোগ্যতা ও শর্তের প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পানি সরবরাহ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার মতে উভয় সংস্থার নিয়োগ বিজ্ঞাপনে যোগ্যতা একই রকম হওয়া প্রয়োজন ছিল।’
এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) এ কে এম তারিকুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি তো চট্টগ্রাম ওয়াসার বিষয়ে বলতে পারব না। আমরা মনে করেছি ঢাকা ওয়াসার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে একজন প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া সমীচীন হবে। তাই শর্তে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন সেক্টরে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রকৌশলীরা আবেদন করতে পারবেন বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। ’
তাহলে চট্টগ্রাম ওয়াসায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে কেন ঢাকা ওয়াসার যোগ্যতার আদলে দেওয়া হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় চট্টগ্রাম ওয়াসার নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন অনুবিভাগ) এ এইচ এম কামরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হুম, এটা আমাদের ভুল হয়েছে। উভয় সংস্থায় নিয়োগের যোগ্যতা একই রকম হবে। আমরা ঢাকা ওয়াসার যোগ্যতার আদলে আবারও সংশোধিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করব।’
নিয়োগ বিজ্ঞাপনে বৈপরীত্য কি? : বিভিন্ন গণমাধ্যমে গত ২৩ ও ২৪ মার্চ ঢাকা ও চট্টগ্রাম ওয়াসায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। ঢাকা ওয়াসার ক্ষেত্রে আবেদনের শেষ সময় ১৫ এপ্রিল ও চট্টগ্রাম ওয়াসার ক্ষেত্রে ১৬ এপ্রিল দেওয়া হয়। ঢাকা ওয়াসার জন্য প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের দুই নম্বর শর্তে প্রার্থীকে অবশ্যই পানি সরবরাহ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পয়ঃনিষ্কাশন সেক্টরে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে বলা হয়।
অপরদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সেই বিজ্ঞাপনের তিন নম্বর শর্তে পানি ব্যবস্থাপনা এবং পয়ঃনিষ্কাশন সেক্টরে ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা অথবা সাধারণ প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় সিনিয়র পর্যায়ে অন্তত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অভিজ্ঞতায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম ওয়াসায় যেমন ৫ বছরের পার্থক্য রয়েছে তেমনিভাবে সাধারণ প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কর্মকর্তারা আবেদন করতে পারবেন বলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে।
শুধু এই যোগ্যতার ক্ষেত্রেই প্রার্থীর বয়সের ক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসায় যেখানে অনূর্ধ্ব ৬০ বছর চাওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসায় চাওয়া হয়েছে ৫৫ বছর।
সংশোধিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কি প্রার্থীর বয়সও পরিবর্তিত হবে? এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম ওয়াসার নিয়োগ কমিটির এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘নিয়োগ বিজ্ঞাপনের সকল শর্ত ঢাকা ওয়াসার আদলে হবে।’
উল্লেখ্য, উভয় সংস্থা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন, ১৯৯৬ এর আদলে পরিচালিত হয়ে আসছে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সরকার অপসারণ করতে পারছিল না। কারণ সেই আইনে ব্যবস্থাপনা পরিচালকগণ নিজ থেকে পদত্যাগ করতে না পারলে তাদেরকে সরকার অপসারণ করতে পারার কোনো আইন ছিল না। পরবর্তীতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ২৪ অক্টোবর ২৮(ক) নামে নতুন একটি ধারা ‘সরকার জনস্বার্থ বিবেচনায় যেকোনো সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ ও নিয়োগ দিতে পারবেন’ বলে সংযোজন করেন। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া যেত না। পূর্বেকার ধারায় ওয়াসা বোর্ডের পক্ষ থেকে একজনকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাবনা করা হবে এবং সেই আলোকে সরকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেবেন। একইসঙ্গে সকল ওয়াসার কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জনস্বার্থে সরকার চাকুরি থেকে অপসারণও করতে পারবেন বলে ধারা যুক্ত করা হয়। উভয় সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করার পর সরকারের পক্ষ থেকে একজনকে দায়িত্ব দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।