রাজধানীর হাজারীবাগে গণপিটুনিতে দুই চাঁদাবাজের মৃত্যুর পর সামনে আসতে শুরু করে তাদের নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের চিত্র। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় রয়েছে নানা অপরাধে অন্তত ১২টি মামলা। দীর্ঘদিন ধরে তাদের চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ ছিল দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। এসব লোকের আয়ের ওপর ভিত্তি করে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নির্ধারণ করত। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুব্ধ ছিলেন এলাকাবাসী। সুযোগ পেয়ে দুই চাঁদাবাজের ওপর ক্ষোভ মেটান তারা।
গত বুধবার রাত ১১টার দিকে কামরাঙ্গীরচরের সিলেটিয়া বাজার এলাকায় গণপিটুনিতে মাসুদ (২৯) ও নাদিম (৩৫) নামে দুই যুবক নিহত হন। ওই ঘটনায় সোহাগ (২৮) নামে আরও একজন আহত হয়েছেন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে মাসুদের নেতৃত্বে চাঁদাবাজচক্রের সদস্যরা স্থানীয় চা দোকানি নুর মোহাম্মদের কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি তখন তাদের ১ লাখ টাকা দেন। পরবর্তীতে ৭ মার্চ রাতে বাকি ১ লাখ টাকার জন্য গেলে তিনি দিতে না পারায় তাকে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করা হয়। সে সময় তার স্ত্রী বাধা দিতে গেলে তাকেও ছুরিকাঘাতে আহত করা হয়। ওই ঘটনায় নুর মোহাম্মদ ৮ মার্চ মামলা করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাত পৌনে ১০টার দিকে মামলার অন্যতম আসামি নাদিম, মাসুদ ও সোহাগসহ আরও ৫/৬ জন দুটি মোটরসাইকেলে করে বাজারে এসে পুনরায় দোকানিদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে এবং মামলা তুলে নিতে চাপ সৃষ্টি করে। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রাত সোয়া ১০টার দিকে তারা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় মামলার বাদী ও তার শালা মনির হোসেনকে বেধড়ক মারধর ও ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত করা হয়। তখন উত্তেজিত জনতা ধাওয়া করে তাদের ধরে গণপিটুনি দেয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নিহতদের মধ্যে নাদিম লালবাগ শহীদনগরের বাসিন্দা ও চাঁদাবাজ দলের প্রধান। তার বাবার নাম সুলতান। নিহত মাসুদের বাসা কামরাঙ্গীরচরের আচারওয়ালা ঘাট এলাকায়। তার বাবা সোনাই মিয়া কামরাঙ্গীরচর থানা যুবলীগের সাবেক সহ-সভাপতি বলে জানা গেছে। চক্রের অন্য সদস্যদের মধ্যে আহত সোহাগ, পলাতক পাত্তি, ইমনসহ অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জনের বাসা লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচরসহ বিভিন্ন এলাকায়। এই চক্রটি লালবাগ-চকবাজার এলাকার শীর্ষসন্ত্রাসী পিচ্চি মনিরের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত হতো।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ১০০ থেকে ১৫০ জন দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি, ইট-বালু-সিমেন্ট দোকানের শ্রমিক-জোগালি সিলেটি বাজার এলাকায় কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে নানা অজুহাতে এসব অসহায় মানুষদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে আসছিল নাদিম, মাসুদ ও সোহাগসহ একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীচক্র। চাঁদা না দিলে অপহরণ, মারধর, হুমকি এবং মুক্তিপণ আদায় ছিল নিয়মিত ঘটনা। ভয়ে অনেকে চাঁদা দিতেন, আবার কেউ সাহস করে মামলা করেছেন চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী দুলাল সরদার জানান, রোজার আগে তার পরিচিত আক্তার সরদার ও কাজল সরদারকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় ওই চক্র। এরপর নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে একজনকে ১ লাখ এবং আরেকজনকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে আনেন তারা।
সার্বিক বিষয়ে কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি আমিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘটনার সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় পুলিশ চেষ্টা করেও জনতার রোষ থামাতে পারেনি। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বর্তমানে এলাকায় যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় আহত চা দোকানির শ্বশুর বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। এ ছাড়া মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ একটি মামলা করবে বলেও জানান তিনি।