মৃত্যু জীবনের এক অনিবার্য সত্য। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এর থেকে কেউ বাঁচতে পারবে না। তাই মুমিন মুসলমান মৃত্যুর জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে। মৃত্যুর মাধ্যমেই দুনিয়ার জীবনের সমাপনী আসে এবং আখেরাতের অনন্ত-অসীম জীবনের সূচনা হয়। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর তার সওয়াব লাভের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের সওয়াব বন্ধ হয় না। এক. সদকায়ে জারিয়া। দুই. এমন জ্ঞান, যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। তিন. এমন নেক সন্তান, যে তার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম) এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।
সদকায়ে জারিয়া : সদকা অর্থ দান। আর জারিয়া অর্থ চলমান। সদকায়ে জারিয়া অর্থ এমন দান, যার কল্যাণ অব্যাহত থাকে। হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, সদকায়ে জারিয়া হলো এমন দান, যার উপকার বিদ্যমান থাকার কারণে তার প্রতিদানও চলমান থাকে। মূলত সদকায়ে জারিয়া একটি প্রবহমান নদীর মতো, যার পানি কখনো শেষ হয় না। যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, পুকুর খনন, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি। মসজিদে মানুষ নামাজ আদায় করলে মসজিদ নির্মাতার নামেও সওয়াবের একটা অংশ পৌঁছে যাবে, যা সে মৃত্যুর পরও কবরে শুয়ে পেতে থাকবে। অনুরূপভাবে মাদ্রাসা বা অন্য কোনো কল্যাণকর কাজ করে গেলে মৃত্যুর পরও মানুষ সওয়াব পেতে থাকবে। তাই আমাদের করণীয় হলো, বেশি বেশি সদকায়ে জারিয়ার কাজ করে যাওয়া। তাহলে কবরে যাওয়ার পরও আমরা এর সওয়াব পেতে থাকব।
জ্ঞান : এমন জ্ঞান, যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। যেমন ধর্মীয় ও মানবকল্যাণ বিষয়ক বই-পুস্তক রচনা করা। সুযোগ্য শিষ্য তৈরি করা। যারা তার পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে জ্ঞান বিতরণ করবে। মানুষ সে অনুযায়ী আমল করে যে নেকি হাসিল করবে সেখান থেকে সে একটি অংশ পাবে।
নেক সন্তান : এমন নেক সন্তান, যে তার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করে। মা-বাবার মৃত্যুর পর কবরের পাশে গিয়ে বা দূর থেকে দোয়া করবে, এমন সন্তান দুনিয়ায় রেখে যেতে চাইলে সর্বপ্রথম মা-বাবাকে হতে হবে একজন আদর্শবান ও আল্লাহভীরু। সন্তানদের দিতে হবে ধর্মীয় শিক্ষা ও উত্তম আদর্শ। তাহলেই সে মা-বাবার মৃত্যুর পর দোয়া করবে। কবর জিয়ারত করবে।
অপর এক হাদিসে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মৃত্যুর পরও বান্দার জন্য কবরে নেকির ধারা জারি রাখে যে ৭টি বিষয়। তা হলোÑ এক. কাউকে ইলম শিক্ষা দেওয়া। দুই. খাল খনন করা। তিন. কূপ খনন করা। চার. গাছ লাগানো। পাঁচ. মসজিদ নির্মাণ করা। ছয়. কাউকে কোরআনের উত্তরাধিকার বানিয়ে দেওয়া। সাত. মৃত্যুর পর এমন নেক সন্তান রেখে যাওয়া, যে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (শুআবুল ইমান ৩৪৪৯)
মৃতের জন্য সওয়াব পৌঁছানোর পদ্ধতি : ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবিতরা মৃতের উদ্দেশে বিশেষ কয়েকটি কাজের মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছাতে পারে। এমন কয়েকটি কাজ উল্লেখ করা হলো।
ভালো কাজের আলোচনা করা : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের মৃতদের ভালো কাজগুলোর আলোচনা করো এবং মন্দ কাজের আলোচনা থেকে বিরত থাকো।’ (আবু দাউদ)
মাগফিরাতের দোয়া করা : মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর এই দোয়া বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সব মুমিনদের ক্ষমা করুন।’ (সুরা ইব্রাহিম ৪১) অন্যত্র নুহ (আ.)-এর এই দোয়া বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে ইমানদার হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করেছে তাকে এবং সব মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে ক্ষমা করুন।’ (সুরা নুহ ২৮) মা-বাবার মাগফিরাতের জন্য পবিত্র কোরআনে এই দোয়া বর্ণিত হয়েছে, ‘রব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।’ অর্থ : হে আমার প্রতিপালক! আপনি তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন। (সুরা বনি ইসরাইল ২৪)
দান-সদকা করা : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, সাদ ইবনে উবাদা (রা.)-এর অনুপস্থিতিতে তার মা ইন্তেকাল করেন। তিনি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, আমার অনুপস্থিতিতে আমার মা মারা গেছেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তার কোনো উপকারে আসবে? রাসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ। সাদ (রা.) বলেন, আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমার ‘মিখরাফ’ নামক বাগানটি আমার মায়ের জন্য সদকা করে দিলাম। (সহিহ বুখারি)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, আমার পিতা ইন্তেকাল করেছেন এবং ধন-সম্পদ রেখে গেছেন। কিন্তু অসিয়ত করে যাননি। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তার গুনাহের কাফফারা হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ।’ (সহিহ মুসলিম)
ছুটে যাওয়া নামাজ-রোজার ফিদিয়া আদায় করা : মা-বাবার ছুটে যাওয়া নামাজ-রোজার জন্য প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পরিবর্তে এবং প্রতি রোজার পরিবর্তে এক মুদ (বর্তমান বাজার অনুযায়ী পৌনে দুই কেজি) পরিমাণ গম সদকা করা। ইকরিমা (রহ.) বলেন, ‘আমার মা প্রচণ্ড তৃষ্ণা রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং রোজা রাখতে সক্ষম ছিলেন না। তার সম্পর্কে আমি তাবেয়ি তাউস (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, প্রতিদিনের জন্য একজন মিসকিনকে এক মুদ (বর্তমান বাজার অনুযায়ী পৌনে দুই কেজি) পরিমাণ গম প্রদান করবে।’(মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৭৫৮১)
নফল নামাজ-রোজা আদায় করা : সন্তান মৃত মা-বাবার জন্য নফল নামাজ আদায়ের মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছাতে পারে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! জীবদ্দশায় আমি আমার মা-বাবার অনুগত ছিলাম। তাদের মৃত্যুর পর আমি কীভাবে তাদের আনুগত্য করব? উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, ‘মৃত্যুর পর তাদের আনুগত্য হলো, তুমি নামাজ পড়ার সময় তাদের জন্য নামাজ পড়বে এবং তুমি রোজা রাখার সময় তাদের জন্য রোজা রাখবে।’ (আওজাজুল মাসালিক ইলা মুয়াত্তা মালিক)
হজ-ওমরাহ ও কোরবানির মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছানো : মৃত মা-বাবার পক্ষ থেকে হজ, ওমরাহ ও কোরবানি করেও সওয়াব পৌঁছানো যায়। (সহিহ বুখারি ১৮৫২)
ঋণ পরিশোধ করা : মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা সন্তানের দায়িত্ব। জাবের (রা;) রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে তার পিতা আবদুল্লাহ বিন হারামের ঋণ পরিশোধ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি ২৭৮১) এতে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বান্দার হক আদায় হয়ে যায়। অন্যথায় বান্দার হকের কারণে পরকালে নিজের সওয়াব দিয়ে দিতে হবে অথবা পাওনাদারের গুনাহ বহন করতে হবে। (মুসতাদরাকে হাকেম)
ওয়াদা বাস্তবায়ন করা : মৃত ব্যক্তি কোনো ওয়াদা করে গেলে তা বাস্তবায়ন করা সন্তানের দায়িত্ব। সন্তান যথাসম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৩৪)
আমাদের অনেকের কাছের আত্মীয়স্বজন ইন্তেকাল করেছেন। আমাদের দায়িত্ব হলো, তাদের জন্য দোয়া করা এবং সাধ্য অনুযায়ী তাদের জন্য উল্লিখিত পদ্ধতিতে সওয়াব পৌঁছানো। এতে মহান আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করবেন। তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। তারা কবরে অসহায় এবং তারা আমাদের পক্ষ থেকে একটু দোয়া ও সওয়াব পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকেন। আমরা যদি তাদের জন্য এই কাজটুকু করি তাহলে আমাদের সন্তান-সন্ততিও মৃত্যুর পর আমাদের জন্য দোয়া করবে এবং বিভিন্ন নেক কাজের মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছাবে।