ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এজন্য কমিশন ৪০ দিন সময় দিলেও গত ৩০ দিনে মাত্র একটি দল নিবন্ধনের আবেদন করেছে। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কমিশন অবশ্য বলছে, একাধিক দলের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে; তারা শিগগির আবেদন করবে। রাজনৈতিক নেতারা ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিবন্ধনের কঠোর ও জটিল শর্তাবলির কারণে দোটানা তৈরি হয়েছে। কেউ মনে করছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারবিষয়ক কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত না হলে অধিকাংশ দল নিবন্ধনে আগ্রহ দেখাবে না।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য গত ১০ মার্চ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে নির্বাচন কমিশন। আবেদনের সময় বেঁধে দেওয়া হয় ২০ এপ্রিল পর্যন্ত। এর মধ্যে একটি মাত্র দল আবেদন করেছে।
ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশ কিছু নতুন দল হয়েছে। পুরনো কিছু দলও রয়েছে, যারা আগেও নিবন্ধনের আবেদন করেছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আদালতদের মাধ্যমে নিবন্ধন পেয়েছে। যারা নিবন্ধন পেতে আগ্রহী তারা কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। শেষ সময়ে হয়তো আবেদন জমা পড়বে।
চলমান আইনে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছিল রাজনৈতিক দলগুলো। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের অধীনে সংশোধিত আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অনুযায়ী দলগুলোর নিবন্ধন চালু হয়। ওই সময় নবম সংসদকে সামনে রেখে শর্তসাপেক্ষে ৪০টি দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল, একটা যোগ্যতা নিয়ে যেন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়।
বিগত সময়ে নিবন্ধন পদ্ধতি এবং যেসব দলকে নিবন্ধন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বেশ কয়েকটি দল। তাদের অভিযোগ নির্বাচন প্রভাবিত করতেই এ প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে নির্বাচন কমিশন।
এমতাবস্থায় নিবন্ধনের শর্ত কিছুটা সহজ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইনে সংশোধনী আনার সুপারিশ করেছে নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। তাদের সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, ফলে বিদ্যমান আইন মেনেই রাজনৈতিক দলগুলোকে আবেদন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যদি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৯০ (ক) ধারা অনুযায়ী, বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেতে চাইলে তিনটি শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করতে হবে। প্রথমত, স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত কোনো সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে কমপক্ষে একটি আসনে বিজয়; দ্বিতীয়ত, সেসব নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা যেসব আসনে অংশ নিয়েছেন সেগুলোতে মোট ভোটের ৫ শতাংশ অর্জন এবং তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় অফিস থাকতে হবে; দেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জেলায় জেলা অফিস থাকতে হবে আর অন্তত ১০০টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটান এলাকার থানায় অফিস থাকতে হবে, যার প্রতিটিতে সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ২০০ জন ভোটার থাকবে।
এ ছাড়া নিবন্ধন পেতে আগ্রহী দলের গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা; কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখাসহ আরও কিছু শর্ত রয়েছে।
অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য কিছু শর্ত শিথিলের প্রস্তাব করেছে। তারা বলেছে, নিবন্ধন পাওয়ার জন্য ১০ শতাংশ জেলা ও ৫ শতাংশ উপজেলা বা থানায় দলের অফিস এবং দলটির কমপক্ষে পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে হবে।
কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলো : নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, ‘গত সরকারের আমলে অনেক রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিতে পারেনি। ক্ষমতাসীন দলের পছন্দমতো দলকে নিবন্ধন দেওয়া হতো। এখন সে পরিস্থিতি নেই। তবে আমাদের প্রস্তুতিতে কিছুটা ঘাটতি আছে। নিবন্ধনের সময় বাড়ানোর জন্য আমাদের পক্ষ থেকে আবেদন করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে যে রিট হয়েছে তার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন আবেদনের সময় বাড়িয়ে রাখবে। এর মধ্যে নিবন্ধন নিয়ে ঐকমত্য কমিশন ও সরকার একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে।’
নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া গণবিজ্ঞপ্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ূম। রায় অনুযায়ী ‘রাষ্ট্র সংস্কারে’র ক্ষেত্রে ইসির গণবিজ্ঞপ্তিটি স্থগিত থাকবে।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘আমি সব দলের ক্ষেত্রেই চেয়েছিলাম। আদালতে অন্যান্য দল না আসায় আমার দলের ক্ষেত্রেই রায় হয়েছে। যে গণবিজ্ঞপ্তি হয়েছে সেটা সংবিধানে রাজনৈতিক দলের যে সংজ্ঞা আছে তার পরিপন্থী। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিদ্যমান নিয়ম বাতিল করতে হবে।’
কী বলছে সংস্কার কমিশন : নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, ‘এখনকার যে আইন, এটা কঠোর বলেই তো আমরা শিথিল করার সুপারিশ করেছি। এখন যা আছে, তার চেয়ে আমাদের প্রস্তাব আরও নমনীয়। রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে। নিয়ম সহজ করা হলে যারা খুব বড় দল নয়, তারাও রাজনীতিতে থাকার সুযোগ পাবে। দ্বিতীয়ত, সংস্কারের আগে বা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এমন সিদ্ধান্ত না নিলেই ভালো। এখানে এক ধরনের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সমন্বয়টা হওয়া উচিত ছিল সরকার, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে। সমন্বয়টা হলে নির্বাচন কমিশন এ কাজটা করত না হয়তো।’