গৃহস্থালিতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বিশ্ব এক দিকে হাঁটলেও বাংলাদেশ যাচ্ছে উল্টোপথে। সরকারের তরফ থেকে বারবার সারা বিশ্বে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ সংকুচিত হয়ে আসার কথা বলা হলেও পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। শহর এলাকায় গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে এখনো পাইপলাইনকেই সবচেয়ে সস্তা ও নিরাপদ মনে করছে বিভিন্ন দেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজির পরিবর্তে এলএনজি আমদানি করে শহর এলাকায় পাইপলাইনে সরবরাহ বাড়ালে বছরে এক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে বাড়ছে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহের নেটওয়ার্ক। জাপানের শহর এলাকার বড় অংশে পাইপলাইনেই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাংলাদেশে এলএনজির আওতা কমে আসার শঙ্কার পাশাপাশি বাড়ছে এলপিজি-নির্ভরতা। বেসরকারি খাতের একতরফা নিয়ন্ত্রণ থাকায় এলপিজির দামে নাগাল পরানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশে তিতাস গ্যাসের প্রথম গৃহস্থালি গ্রাহক ছিলেন কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান। মুক্তিযুদ্ধের তিন বছর আগে ১৯৬৮ সালে শওকত ওসমানের ঢাকার বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। এখন দেশের সবগুলো গ্যাস বিতরণ কোম্পানি মিলিয়ে দেশে গৃহস্থালির গ্রাহক সংখ্যা ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী দেশের শহরাঞ্চলে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ মানুষ বসবাস করে। দেশের মোট সাড়ে তিন কোটি পরিবারের মধ্যে শহরাঞ্চলের পরিবারের সংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখ থেকে এক কোটি ৪০ লাখ। অথচ পাইপলাইনের গ্যাসের গ্রাহক হিসাবে এক কোটির বেশি পরিবার সরকারি সেবার বাইরে রয়েছেন। শহরের যে ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার পরিবারের ঘরে গ্যাস রয়েছে তাও সরকার পর্যায়ক্রমে কেটে দিতে চায়। শহরাঞ্চলের পরিবারগুলোর মধ্যে ২৬ ভাগ পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করছে। সারা দেশের হিসাবে এর পরিমাণ ১০ দশমিক ৫ ভাগের বেশি নয়।
এলপিজি এবং এলএনজি কী : এলপিজি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস। জ্বালানি তেল পরিশোধনের সময় প্রপেন ও বিউটেন দুটি উপজাত বের হয়। নির্দিষ্ট পরিমাপে এই দুটি উপজাতের মিশ্রণে তৈরি করা হয় এলপিজি। সিলিন্ডারে ভরে এই গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে খনি থেকে সরাসরি উত্তোলিত গ্যাসকে বিশেষ রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠা-া করা হয়। এই তাপমাত্রায় গ্যাস তরলে পরিণত হয়, যা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি নামে পরিচিত। তরল করার কারণে গ্যাসের আয়তন কমে আসে। ফলে পরিবহন সহজ হয়। সমুদ্রপথে জাহাজে করে এনে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। দেশের বড় শহরগুলোতে পাইপলাইন থাকায় এলএনজি আমদানি করেই সরবরাহ করা সম্ভব। অন্যদিকে এলপিজি আমদানি করা হলে সিলিন্ডারে ভরে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে বাড়তি খরচ হয়।
বিভিন্ন দেশের চিত্র : জাপান গ্যাস অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান বলছে, দেশটির মোট পরিবারের ৪৮ ভাগই সিটি গ্যাস বা টাউন গ্যাস ব্যবহার করে। জাপানে তিন কোটি গ্রাহকের ঘরে পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। এলএনজি আমদানি করে তা গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাসাবাড়িতে সরবরাহ করে জাপান। সাধারণত শহর এলাকায় এই গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
ভারতের প্রদেশগুলোর মধ্যে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা, আসাম, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা রাজ্যের ১৫০টিরও বেশি জেলা এবং ২৬০টির বেশি পৌর এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহের বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভারতের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস রেগুলেটরি বোর্ড বলছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০৩৪ সালের মধ্যে ৭৮৪টি জেলায় পাইপলাইনের গ্যাস সম্প্রসারণ করতে চায়। দেশটিতে পাইপে গ্যাস নিলে ভোক্তাকে প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের ২০২২ সালের একটি হিসাব বলছে, সেখানে পাইপলাইন গ্যাসের ৭ কোটি ৮৭ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহক গৃহস্থালির। যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব উৎসের গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহ করলেও জাপান এবং ভারত এলএনজি আমদানি করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করে। অথচ বাংলাদেশে বারবার শোনানো হয় অন্য কথা। বলা হচ্ছে, বিশ্বের কোথাও পাইপে গ্যাসের বিস্তৃত সরবরাহ নেই এবং বাংলাদেশেও একই নীতি গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশে গৃহস্থালি গ্যাসের কী অবস্থা : পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন সরবরাহ করা গ্যাসের ১১ ভাগ পাইপলাইনের মাধ্যমে বাসাবাড়ির রান্নাঘরে যায়। সে হিসাবে প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলে তার মধ্যে ৩০৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, দেশে গ্যাসের সংকট থাকায় নতুন করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা সম্ভব নয়। অথচ ২০১৮ সাল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। সাবেক আওয়ামী সরকার আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি করলেও অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দুই বছরে নতুন কোনো এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়নি। বর্তমানে প্রতিদিন আমদানি করা এলএনজি থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
গ্রাহকদের এলপিজিতে ঠেলে দিচ্ছে সরকার : দেশে এলএনজি সরবরাহের শুরুতে রান্নার গ্যাসের জন্য কোন গ্যাস উপযুক্ত সে বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তখনকার সদস্য মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে এই কমিটি করা হয়। তারা সব দিক যাচাই-বাছাই করে শহর এলাকায় পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করার বিষয়ে মতামত দেয়। ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয় তখনকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সরকার তখন সালমান এফ রহমানের মতো এলপিজির ব্যবসায়ীদের পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে সাধারণ ভোক্তার জন্য সুবিধাজনক এলএনজি সরবরাহের পক্ষে দেওয়া সেই প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি।
আওয়ামী লীগ সরকার এলএনজি আমদানি করে শহর এলাকায় পাইপ গ্যাসের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বদলে এলপিজির আওতা সম্প্রসারণ করে। সরকারি সূত্রগুলো বলছে এলএনজি আমদানি করলে ডলার সংস্থানসহ অন্য সব দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। অন্যদিকে এলপিজি আমদানি করলে বিষয়টি থাকে বেসরকারি কোম্পানির হাতে। এক্ষেত্রে সরকারকে কোনো দায় নিতে হয় না। দেশে এখন প্রতি বছর ১৫ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই চাহিদা বেড়ে হবে ৪০ লাখ টন। বর্তমানে এলপিজি বাজারের মাত্র ২ শতাংশ সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে। বাকি ৯৮ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি কোম্পানির হাতে। ফলে প্রতি মাসে সরকার এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও বেসরকারি উদ্যোক্তারা তা মানছেন না। এতে বাজারে অস্থিরতা বেড়েই চলেছে।
চাইলেই এলএনজির আওতা বাড়ানো সম্ভব : দেশে ছোট ছোট জাহাজে করে এলপিজি আনেন ব্যবসায়ীরা। তবে এলএনজির জন্য বড় অবকাঠামো প্রয়োজন। দেশে এখন দুটি টার্মিনাল রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার উদ্যোগ নিলে মহেশখালীতেই আরও দুটি এবং পায়রা বন্দর এলাকায় আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সম্ভব। এখন মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যে পাইপলাইন রয়েছে তার মাধ্যমেও প্রতিদিন আরও ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। এছাড়া স্মল স্কেলে (ছোট আকারের) এলএনজি আনার সুযোগ রয়েছে। গভীর সমুদ্রে এলএনজি জাহাজের ড্রাফট সাধারণত ৮ থেকে ৯ মিটার হয়। তবে আড়াই থেকে সাড়ে তিন মিটার ড্রাফটের ছোট জাহাজও রয়েছে যেগুলো নদীতে চলতে পারে।
এলএনজি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী : এলপিজি বাতাসের চেয়ে ভারী। তাই দুর্ঘটনাবশত লিকেজ হলে পায়ের কাছে গ্যাস জমা হয়। এরপর আগুনের সংস্পর্শে এলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে এলএনজি বাতাসের চেয়ে হালকা হওয়ায় পাইপে লিকেজ হলে সহজেই খোলা জানালা দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমে আসে। আবার রান্নার কাজে এলএনজি ব্যবহার করা হলে ৭০ ভাগ অগ্নিদক্ষতা পাওয়া যায়। অর্থাৎ যে পরিমাণ এলএনজি সরবরাহ করা হয় তার ৭০ ভাগই কাজে লাগে। অন্যদিকে সাধারণত প্রথাগত এলপিজি চুলায় জ্বালানি দক্ষতার হার প্রায় ৫৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরাও পাইপে গ্যাস সরবরাহের পক্ষে : ২০১৮ সালে সরকারিভাবে গঠন করা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কিনে আনা হলে ১৬ থেকে ১৭ ডলারের মধ্যে পাওয়া যাবে। অথচ সমপরিমাণ এলপিজি আমদানির জন্য প্রয়োজন হচ্ছে ২২ থেকে ২৩ ডলার।’
শহরাঞ্চলে পাইপে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে আরও বিভিন্ন দিক থেকেও সাশ্রয় হবে বলে মনে করেন মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শহরে যে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ মানুষ বসবাস করে তাদের পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে পারলে আমি মনে করি বছরে এক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।’ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন বাড়ানো হলেও আর্থিক সাশ্রয়ের পরিমাণ তেমন কমবে না বলে তিনি মনে করছেন।
সরকারি সংস্থাগুলোও পাইপে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পক্ষে। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবাসিকে নতুন গ্যাসের সংযোগ আবার চালু করার জন্য আমরা অনেক সুপারিশ করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আমরা এটিও বলেছি কোথাও ছোট বাড়িতে গ্যাসের লাইন ছিল, এখন সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অন্তত সেখানে গ্যাসের লাইন দেওয়া হোক। তাহলে গ্যাসের চুরিও বন্ধ হতো।’