চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণসভা আজ শনিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। গতকাল শুক্রবার বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে এই তথ্য জানানো হয়। এদিকে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানান, আগামী ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৯ দিনের কর্মসূচির শেষ দিন আগামী ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র সমাবেশেও প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি আয়োজিত জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬ সফল করতে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ একটি প্রতিনিধি দল অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন। এ ছাড়া জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে। এটি ৫ আগস্ট উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গত বছর দেশজুড়ে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ, বিজয় মিছিল, কনসার্ট, ড্রোন শো, এবং তথ্যচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এসব কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। ২০২৫ সালে এই অভ্যুত্থানের এক বছর (১ম বার্ষিকী) পূর্ণ হয়েছে। টানা ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন এবং বিপুল আত্মত্যাগের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে এই অভ্যুত্থান চূড়ান্ত সফলতা লাভ করে, যা আন্দোলনকারীদের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবেও পরিচিত।
অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৯ দিনের কর্মসূচির শেষ দিন আগামী ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র সমাবেশেও প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এই কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি শেষ হবে আগামী ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র সমাবেশের মধ্য দিয়ে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার সংকট এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ। এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন রাষ্ট্র বা ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বুনে দিয়েছে, যার সংস্কার প্রক্রিয়া এখনও চলমান। বিএনপি সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।
৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী : সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ আগামী ৫ আগস্ট উদ্বোধন করা হবে। উদ্বোধনের পর এটি দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, জাদুঘরটিতে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, দুর্লভ দলিল, সংবাদপত্রের সংরক্ষিত প্রতিবেদন, আন্দোলনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, শহীদ ও আহতদের ব্যক্তিগত স্মারক, পোশাক, ব্যানার, প্ল্যাকার্ডসহ নানা নিদর্শন স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল ডিসপ্লের মাধ্যমে আন্দোলনের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হবে। গবেষক ও দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে তথ্যভিত্তিক আর্কাইভও। জাদুঘরটি শুধু স্মৃতিচারণের স্থান নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস, ত্যাগ ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
গত বুধবার সচিবালয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ পালন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন উপলক্ষে এক সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বৈঠক শেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব বলেন, উদ্বোধন সামনে রেখে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো শেষ মুহূর্তের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। প্রদর্শনীর উপকরণ সংযোজন, নিরাপত্তাব্যবস্থা, দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল কনটেন্ট স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একাধিকবার উদ্বোধনের ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত খোলা হয়নি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালুর দাবি জানিয়েছে জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স ও শহীদ পরিবার। শুধু নাম চালু না করে জাদুঘরের কার্যক্রম পুরোপুরি কার্যকর করা এবং কোনো ষড়যন্ত্র যাতে এটি স্থবির করতে না পারে, সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি দিকনির্দেশনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আহ্বান করা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের মুখপাত্র সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ সৈকতের বোন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয় পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ৫ আগস্ট এই জুলাই স্মৃতি জাদুঘর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু আমরা জানতে পারি, গত সপ্তাহের শেষে সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা একটি সভায় জানিয়েছেন যে তিনি জাদুঘরের নিয়োগবিধিতে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন। আমাদের প্রশ্ন, জনতার ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সর্বসম্মতভাবে জুলাই জাদুঘর আইন পাস করেছে, তাহলে এক আমলা হয়ে সেই আইনে পরিবর্তন আনার অনুমোদন তিনি কোথায় পেলেন?
সংগঠনটি এই পরিবর্তন আনার পরামর্শকে ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে এর পেছনে দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে বলে উল্লেখ করে। তাদের ভাষ্য, জাদুঘরের চূড়ান্ত নিয়োগপ্রক্রিয়াকে কমপক্ষে আরও দুই মাস পিছিয়ে দেওয়া এবং স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য লোকদের সংবেদনশীল প্রজেক্টে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, জাদুঘরটি চালাতে হলে যোগ্যতার ভিত্তিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক লাগবে। যারা জাদুঘর গড়ে তোলার পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এবং রূপরেখা ও নকশা তৈরিতে কাজ করেছেন, তাদেরকেই সম্পৃক্ত রাখতে হবে। জাতীয় সংসদে বর্তমানে যে আইন পাস করা হয়েছে, সেই আইন মোতাবেকই যোগ্যতার ভিত্তিতে এই বিশেষায়িত নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে।
সংগঠনটির অভিযোগ, ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু জাদুঘর উদ্বোধনেই বিলম্ব করাচ্ছে না, বরং এটিকে প্রশাসনিক বা কাঠামোগতভাবে পুরোপুরি অকার্যকর করতে চাইছে। এ ছাড়া জাদুঘরকে প্রশাসনিক অসহযোগিতা করা, বাজেট ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ আটকে রেখে একে অচল করে দেওয়া, মানুষ যাতে সঠিক ইতিহাস না জানতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এর মর্যাদা ক্ষুণœ হয়, সেই পরিকল্পনা চলছে।
এর আগে গত বুধবার রাজধানীর রায়েরবাজারে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের গণকবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাদুঘর খুলে দেওয়া না হলে জনগণ নিজেরাই সেখানে প্রবেশ করবে বলে হুশিয়ারি দেন তিনি।