ফুল ভাসিয়ে শুরু বৈসাবি

সবেমাত্র তখন পূর্ব আকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। আর এরই মধ্যে রাঙ্গামাটির কেরাণীপাহাড় এলাকায় কাপ্তাই হ্রদের তীরে হাজির হয়েছেন শতশত পাহাড়ি তরুণ-তরুণী। ঐতিহ্যবাহী পিনন-হাদির পোশাকে তরুণী এবং ধুতি-পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে হাতে ফুল, পাতা নিয়ে তরুণরা ছুটে চলছে কাপ্তাই হ্রদের তীরে। তীরে গঙ্গা মায়ের উদ্দেশে ফুল উৎসর্গ করে কলার পাতায় সেই ফুল পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন তারা। এই উৎসবটি চাকমা জনগোষ্ঠী ‘ফুল বিজু’, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ‘হারিবসু’ আর মারমা জনগোষ্ঠী ‘সূচিকাজ’ নামে পরিচিত। ঠিক ফুলবিজু নামে অভিহিত না হলেও এই দিন প্রায় সব পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীই রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পানিতে ফুল ভাসানোর আনুষ্ঠানিকতা পালন করে। এবার ঢাকার রমনা লেকে ফুল ভাসিয়ে বিজুর শুরুর আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা বর্ষকে বিদায় জানানোর এ অনুষ্ঠান তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত। এই উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠী বিজু নামে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী মানুষ সাংগ্রাই, মারমা জনগোষ্ঠী মানুষ বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বিষু, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে থাকে। বৈসুকের ‘বৈ’ সাংগ্রাইয়ের ‘সা’ ও বিজু, বিষু ও বিহুর ‘বি’ নিয়ে উৎসবটিকে সংক্ষেপে ‘বৈসাবি’ নামে পালন করা হয়।

আমাদের রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়িরা ফুল ভাসিয়ে দিনটি শুরু করেছেন। ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলবিজু উপলক্ষে শহরের রাজবন বিহার ঘাট, গর্জনতলী মধ্যদ্বীপসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে পানিতে ফুল ভাসানো হয়। পানিতে ফুল ভাসিয়ে নিজ পরিবার এবং দেশ তথা সমগ্র জীবের মুক্তির জন্য গঙ্গা দেবীর কাছে প্রার্থনা করা হয়। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ বেদনাই যেন ভাসিয়ে দিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার আলো জ¦ালান পাহাড়ের বাসিন্দারা।

কাপ্তাই হ্রদে ফুল নিবেদন করে অনিতা চাকমা বলেন, ফুল বিজুর দিনে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল নিবেদন আমাদের ঐতিহ্য। পাশাপাশি আজকে থেকেই বর্ষবরণের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। আগামীকাল মূল বিজু এবং পরশু পহেলা বৈশাখ পালন করব। ফুল নিবেদন করে আমরা গঙ্গা দেবীর কাছে সুখ ও সমৃদ্ধি প্রার্থনা করি।

রাজবন বিহারের পূর্ব ঘাটে বিঝু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-বিহু-সাংক্রাই-চাংক্রান-পাতা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে কাপ্তাই হ্রদে ফুল নিবেদনের মাধ্যমে তাদের চারদিনব্যাপী অনুষ্ঠান শেষ করেছে গতকাল। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার। তিনি বলেন, বিজু মানে চেতনা, বিজু মানে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে চলার প্রেরণা দেয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ যে বঞ্চনা, লাঞ্ছনা শিকার হয়েছেন, সেটা দূর হয়ে একসঙ্গে পথ চলার শক্তি এই বিজু। বিজুর মাধ্যমে সবার মধ্যে কল্যাণের বার্তা পৌঁছে যাক।

আজ রবিবার বছরের শেষ দিন চৈত্র সংক্রান্তিতে ৫ জন আতিথেয়তা এবং পরের দিন নববর্ষে বিহারে বিহারে প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া বছরের প্রথম দিন সোমবার জলকেলির মাধ্যমে মারমারা সাংগ্রাই উৎসব উদ্যাপন করবে। বৈসাবি উপলক্ষে গত দশ দিন ধরে চলছে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাসহ আরও নানান আয়োজন। যা আরও এক সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে।

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর তীরে ফুল বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী চাকমাদের বিজু এবং তঞ্চঙ্গ্যাদের বিসু উৎসব। গতকাল সকালে সবাই দলবদ্ধভাবে নদীর তীরে বসে বিভিন্ন ধরনের ফুল দিয়ে সাজানো কলাপাতায় শ্রদ্ধাভরে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসিয়ে দেন। এ সময় তারা পুরাতন বছরের গ্লানি ভুলে নতুন বছরের শুভ কামনা করেন।

বিষু উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব নাজিব তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আমাদের তিনদিনব্যাপী নানা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। ফুল বিজুর পর সন্ধ্যায় রয়েছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আশা করি, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উদ্যাপন করতে পারব।

আজ রবিবার সকালে নতুন বছরে পিঠা ও মিষ্টান্ন পরিবেশন এবং সোমবার সন্ধ্যায় সমগ্র জাতির শান্তি সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামানোর লক্ষ্যে বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনার মাধ্যমে ইতিটানা হবে তঞ্চঙ্গ্যাদের বৈসাবি উৎসব।

এদিকে পার্বত্যবাসীর মঙ্গল কামনা করে রমনা লেকে ফুল ভাসিয়ে ফুলবিঝু উৎসব পালন করলেন পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা। গতকাল শনিবার রাজধানীর বেইলি রোড পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স থেকে রমনা পার্ক লেকে র‌্যালিসহ ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ফুল বিঝু উৎসব পালন করেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, আমাদের অনাগত দিনগুলো যেন ভালোভাবে আসে। আমাদের সবার মধ্যে যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারি, এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ যাতে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, পাহাড়ি-বাঙালি যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে মিলেমিশে থাকে এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি করতে পারি সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি।