বিদেশে পলাতক থাকা নগর পুলিশের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ‘উপহার’ হিসেবে দেওয়া অস্ত্র দিয়েই সহযোগীরা জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। গত ৩০ মার্চ রাতে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া একসেস রোড এলাকায় সংঘটিত জোড়া খুনের মামলায় সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে থাকা সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য দিয়েছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জনিয়েছেন নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) আলমগীর হোসেন।
গত ১৫ দিনে চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের তদন্ত কার্যক্রমের অনেক অগ্রগতি হয়েছে দাবি করে সিএমপির এ কর্মকর্তা জানান, দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অবশেষে মুখ খুলতে শুরু করেছে সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ। ইতিমধ্যে এ মামলায় সাজ্জাদসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। জোড়া খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মো. সজীব নামে এক আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র এখনো পর্যন্ত উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের বলে মন্তব্য করে নগর পুলিশের কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এর আগে জোড়া খুনের মামলায় বেলাল ও মানিক নামে দুজন আসামিকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একই মামলায় ছোট সাজ্জাদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজ (১৬ এপ্রিল) সাত দিনের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে ছোট সাজ্জাদসহ অন্য আসামিদের প্রাপ্ত তথ্য যাচাই হচ্ছে।’
জোড়া খুনে গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য সম্ভাব্য সব জায়গায় পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়ে উপকমিশনার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘জোড়া খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রটি পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গিফট হিসেবে ছোট সাজ্জাদকে দিয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে সে (ছোট সাজ্জাদ)। কিন্তু অস্ত্রটি বারবার হাতবদল হচ্ছে। এ কারণে হদিস পেতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে শিগগির একটা ফল আসবে।’
এর আগে থানা থেকে লুটের পিস্তল দিয়েই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে মর্মে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যটি সঠিক নয় মন্তব্য করে সিএমপির এ কর্মকর্তা বলেন, ‘জোড়া খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করে ওই অস্ত্রের ফরেনসিক পরীক্ষা করানোর আগে এর নাম বলা সমীচীন নয়।’ ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, জোড়া খুনে অংশ নেয় ১৩ জন। ব্যবহৃত হয় ছয়টি মোটরসাইকেল। এর মধ্যে তিনটি ছিল ব্যাকআপে। হত্যায় ব্যবহৃত হয় অত্যাধুনিক নাইন এমএম পিস্তল ও শটগান। তবে এখন পর্যন্ত এসব অস্ত্রের একটিও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) মফিজ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানান, জোড়া খুনের মামলায় ছোট সাজ্জাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গত রবিবার (১৩ এপ্রিল) সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম খলিল। এর আগে পুলিশ তার (সাজ্জাদ) দশ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছিল। একই সঙ্গে পুলিশের পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নগরের চান্দগাঁও থানার পাঁচটি, বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি ও হাটহাজারী থানার দুটিসহ আটটি মামলায় ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখিয়েছে আদালত।
গত ১৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স থেকে গ্রেপ্তারের পর ছোট সাজ্জাদকে নগরের চান্দগাঁও থানার তাহসীন হত্যা মামলায় দুই দফায় সাত দিন করে ১৪ দিন রিমান্ডে নেয় পুলিশ। কিন্তু পুলিশের দফায় দফায় জেরায় মুখ খোলেননি ছোট সাজ্জাদ। সাজ্জাদ চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানাসংলগ্ন হাটহাজারীর শিকারপুরের মো. জামালের ছেলে।
গ্রেপ্তারের আগে একের পর এক খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি এবং ফেসবুক লাইভে এসে পুলিশ কর্মকর্তাকে পেটানোর হুমকি দিয়ে আলোচনায় আসেন ছোট সাজ্জাদ। পাঁচটি হত্যাসহ অন্তত ১৬ মামলার আসামি তিনি। ১৫ মার্চ গ্রেপ্তারের পর থেকে ফেসবুক পোস্টে ‘বান্ডিলে বান্ডিলে টাকা ঢেলে’ স্বামীকে জেল থেকে বের করে আনার হুঙ্কার দেন সাজ্জাদের স্ত্রী শারমীন আক্তার তামান্না। ৩০ মার্চ রাতে জোড়া খুনের ঘটনায় সাজ্জাদ হোসেন ও তার স্ত্রীসহ সাতজনকে আসামি করে গত ১ এপ্রিল বাকলিয়া থানায় মামলা করেন নিহত বখতিয়ার হোসেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম। মামলায় ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্নাকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া সাজ্জাদের সহযোগী মো. হাছান, মোবারক হোসেন ইমন, খোরশেদ ও বোরহানকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, সাজ্জাদের সঙ্গে আরেক সন্ত্রাসী সারোয়ারের আগে থেকে এলাকায় আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। সম্প্রতি সাজ্জাদের গ্রেপ্তার এবং এলাকার আধিপত্য নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝামেলা বেড়েছে। তাই সাজ্জাদের লোকজন সারোয়ারকে খুন করতে এ হামলা চালাতে পারে। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি সাজ্জাদ আলী খানের সহযোগী। গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর নগরের বায়েজিদ কালারপুলের একটি নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদা না পেয়ে গুলি করেন সাজ্জাদ। ৬০ জন মিলে ভবনটি নির্মাণ করছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, ভবনমালিকদের সাজ্জাদকে ৫ লাখ টাকা দিতে হয়েছে।
এর আগে গত বছর ৫ জুলাই বায়েজিদ থানার বুলিয়াপাড়ায় একটি বাসায় গুলি করেন সাজ্জাদ তার সহযোগীদের নিয়ে। এ ঘটনায় ইকবাল নামে এক ভুক্তভোগী বাদী হয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা করেন। গত বছর ২৭ অক্টোবর চাঁদা না পেয়ে নগরের হাজীরপুল এলাকার মো. হাছান নামে এক ঠিকাদারের বাসায় গুলি করেছিলেন সাজ্জাদ। এ ঘটনায় হাছান বাদী হয়ে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার অনন্যা আবাসিক ও বায়েজিদ সীমানা-সংলগ্ন কুয়াইশ এলাকায় গত বছর ২৯ আগস্ট প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় মো. আনিস ও মাসুদ কায়সার নামে দুই যুবককে। ওই ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয় বায়েজিদ ও হাটহাজারী থানায়। গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে নগরের চান্দগাঁও থানার অদূরপাড়া জাগরণী সংঘ ক্লাবসংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে মাইক্রোবাস থেকে নেমেই স্থানীয় ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন তাহসীনকে (২৭) গুলি করে হত্যা করে সাজ্জাদ বাহিনী। এ ছাড়া গত ১২ ডিসেম্বর তাকে (সাজ্জাদ) গ্রেপ্তার করতে অভিযানে গেলে পুলিশকে গুলি করে পালিয়ে যান সাজ্জাদ। এর কয়েক দিন পর ফেসবুক লাইভে বায়েজিদ থানার ওসি আরিফুল ইসলামকে পেটানোর হুমকিও দেন তিনি।