বাজারে ভোক্তার অস্বস্তি বেড়েছে

নিত্যপণ্যের বাজারে চাল, পেঁয়াজ, তেল ও সবজির দাম একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় তা সাধারণ মানুষের সংসার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে গত রোজায় এসব পণ্য কেনায় ভোক্তার যে স্বস্তি ছিল, তা এখন খরচ বৃদ্ধির চাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।

ঢাকার বাড্ডা, রামপুরা, সেগুনবাগিচা, কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি খুচরা এবং পাইকারি বাজারে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে। নাজির-মিনিকেটের মতো পরিচিত চিকন চালের কেজিতে অন্তত ৭-৮ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে খুচরায়। ফলে ভালোমানের চিকন চালগুলো কিনতে হচ্ছে ৮৮-৯০ টাকার মধ্যে। তবে মোটা ও মাঝারিমানের চালের দাম এ সময়ে বাড়েনি, রোজার আগে থেকেই বাড়তে বাড়তে উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। মোটা ও মাঝারিমানের এসব চাল কিনতে ক্রেতাকে এখন ৬০-৭২ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।

বাজারে চালের দামের প্রকৃত চিত্র রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থার (টিসিবি) গতকাল বৃহস্পতিবারের বাজার বিশ্লেষণে পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও দাম বৃদ্ধির একটা ধারণা পাওয়া যায়। টিসিবির তথ্য বলছে, গত বছর একই সময়ের তুলনায় এ বছর ভালোমানের চিকন চালের দাম ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। মাঝারিমানের চালের দাম প্রায় ৮ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম ৫ শতাংশ বেশি।

কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আনিস আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোটা চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও ভালোমানের চিকন চালের দাম ভ্যারাইটি অনুযায়ী ৭-৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে চালের এই উচ্চমূল্য খুব বেশি সময় স্থায়ী হবে না বলেও আশার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বোরো মৌসুমের ধান কাটা শুরু হওয়ায় তিনি এ আশার কথা বলেন। সম্প্রতি সচিবালয়ে সংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘দুই সপ্তাহের মধ্যে বোরো মৌসুমের চাল বাজারে চলে আসবে। নতুন চাল আসলেই দামটা কমে আসবে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় এবারে ফলনও ভালো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘নাজির, মিনিকেটের মতো চিকন চালগুলো বোরো মৌসুমেই উৎপাদন হয়। এ কারণে নতুন চাল এলেই দামটা কমে আসবে।’

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, বোরো মৌসুমে দুই কোটি টনের বেশি চালের জোগান আসে, যা দেশের সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে, কারণ এটিই দেশের চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসুম।

চালের খরচের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সবজি, পেঁয়াজ ও তেলের দাম। বাজার ঘুরে দেখা গেছে আলু, টমেটো ছাড়া ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই, বেশিরভাগই বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকার মধ্যে। পেঁপের দামও এখন ৫০-৬০ টাকা কেজি। নতুন আসা কিছু সবজি ১২০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। বেগুন, করলা কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ৭৫-৮০, পটোল বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা কেজি দরে। বাজারে নতুন আসা ধুন্দল অবশ্য বাজারভেদে ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, বরবটির দাম বাজারভেদে ৮৫-১০০ টাকা কেজি, কচুর লতি ৯০-১১০, ঝিঙা ১১০-১২০ টাকা দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, শীত পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই রোজা শুরু হয়। সে সময় প্রচুর শীতকালীন সবজির সরবরাহ ছিল, যে কারণে দামটাও কম ছিল। এখন গরমকালের সবজিগুলো বাজারে আসছে। কিন্তু শীতে যে পরিমাণ সবজির সরবরাহ থাকে, গরমে সেটা খানিকটা কম থাকে।

এ কথাই জানালেন মেরুল বাড্ডার সবজি বিক্রেতা আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, শীতে সবজির প্রচুর সরবরাহ থাকে, যেটা গরমের সময়ে কমে যায়। এ কারণে প্রতি বছরই গরমে সবজির দামটা বেশ চড়া থাকে। রোজায় শীতের সবজির সরবরাহ ছিল বলেই দামটা সহনীয় ছিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, শীতকালে বাংলাদেশে সবজি উৎপাদন হয় ৩৫ লাখ টনের বেশি, যেটা গরমের সময়ে নেমে আসে মাত্র ১৫ লাখ টনের মধ্যে।

সবজির সঙ্গে হঠাৎ করেই বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। দেশের নতুন মৌসুমের পেঁয়াজ কৃষক থেকে ব্যবসায়ীদের হাতে যাওয়ার পরপরই দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৪০-৪৫ টাকা (বাজার ও মানভেদে) কেজি দরের পেঁয়াজ এখন ৬০-৬৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। অথচ এর কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বিশ্লেষক ও ভোক্তারা।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাত্রই পেঁয়াজ উঠেছে এবং এটা ব্যবসায়ী, আড়তদারদের হাতে গেছে। এ মুহূর্তেই শুরু হলো দাম বাড়ানো। এখন কৃষকের হাতে কোনো পেঁয়াজ নেই। কিন্তু এখন এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২০ টাকা দাম বৃদ্ধি কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, কৃষকই তাদের পেঁয়াজ স্টক করে রাখছে, যে কারণে দাম বাড়ছে। কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের আড়তদার আশরাফ বলেন, পাবনা, ফরিদপুরকেন্দ্রিক আড়তগুলোতে দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ কিছুটা কম। যে কারণে দাম বাড়তে শুরু করেছে। সেখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, কৃষক পেঁয়াজ মজুদ করছে বলে সরবরাহ কম।

এদিকে পেঁয়াজের স্থানীয় মৌসুমের সরবরাহ থাকার কারণে গত ৩১ মার্চ থেকে সরকার আমদানির অনুমতিপত্র দেওয়া বন্ধ রেখেছে। এটাকে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর সঙ্গে অবশ্য দাম বৃদ্ধির তালিকায় যোগ হয়েছে সয়াবিন তেল। সরকার ঘোষণা করে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছে ১৪ টাকা। দাম বৃদ্ধির পর থেকেই ব্যবসায়ীরা বাজারে যে সরবরাহ কমিয়ে রেখেছিল, সেই পরিস্থিতি আবার ঠিক করে ফেলেছে দাম বৃদ্ধির দুদিনের মধ্যেই।

দাম বৃদ্ধিতে তৈরি হওয়া চাপের কথা অবশ্য বাণিজ্য উপদেষ্টা নিজেই স্বীকার করেছেন। উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, তেলের দাম ১৪ টাকা বেড়েছে, সেটা বাড়াতে বাধ্য হয়েছি। সরকারের যে নিজস্ব পরিচালন ব্যয় রয়েছে, সেই টাকাটা তো তুলতে হবে। না হলে রাষ্ট্রের দায় তৈরি হবে। এজন্য এ কষ্টটা আমাদের করতে হয়।

গতকাল সকালে রামপুরায় বাজার করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আল-আমীন। তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের দামে রোজায় যে স্বস্তিটা ছিল সেটা হঠাৎ করেই চলে গেল। সবজি, চাল, তেল সবকিছুর দাম বাড়তি।’

ক্যাবের সহসভাপতি নাজের হোসেন সরকারের নজরদারি বাড়ানোর বিষয়েই জোর দেন। তিনি বলেন, সবজির দাম হয়তো সিজনের কারণে বেড়েছে, কিন্তু চাল ও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির বিষয়টা সরকারের নজরদারি বাড়াতেই হবে। না হলে পেঁয়াজের দামে অস্থিরতা থামবে না।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এপ্রিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট থেকে কমে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশীয় পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। তবে এ মাসে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ মূল্যস্ফীতি সামনের দিকে আরও বেড়ে যেতে পারে। ফলে পণ্যমূল্য কমাতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।