মির্জা আব্বাস বললেন

আপনার ডানে বাঁয়ে আওয়ামী লীগের প্রোডাক্ট

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী হিসেবে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া সাবেক কূটনীতিক সুফিউর রহমানকে ‘আওয়ামী লীগের প্রোডাক্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তিনি বলেছেন, ‘সুফিউর রহমান (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)। এ তো আওয়ামী লীগের প্রোডাক্ট। আরও আওয়ামী লীগের প্রোডাক্ট আপনার ডানে-বায়ে আছে। আপনি (অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস) দয়া করে এদের থেকে সাবধান থাইকেন। ওরা কিন্তু আপনাকে ডিরেল করে ফেলবে। আমি আবারও বলছি সচিবালয়ে চারজন সচিব, সচিবালয়ের বাইরে একজন সচিব মর্যাদায়, আমি নাম বলব না, উনি সচিব ছিলেন, এরা পাঁচজন এবং আপনার উপদেষ্টা পরিষদের কিছু লোক আপনাকে কিন্তু সঠিক রাস্তায় চলতে দেবে না।’

গতকাল বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘গণতন্ত্র ফোরামের’ উদ্যোগে ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র, সংস্কার ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন মির্জা আব্বাস। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নির্বাচন দেবে। ড. ইউনূস বলেছেন, ডিসেম্বরে না হোক, জুনে হবে। এ কথাটাই আমাদের বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একবার বললেন ডিসেম্বর, আবার বললেন জুন। আপনি ডিসেম্বরে বলার পরপরই অন্য আরেকজন বলে দিল জুনে। পরে আপনি এটাকে এনডোরস (অনুমোদন করা) করলেন। এ বিষয়ে সন্দেহ করার মতো যথেষ্ট যুক্তি আছে। নির্বাচনটা যেন না হয়। আমি বিশ্বাস করছি না, আশা করছি। সম্ভবত নির্বাচন খুব তাড়াতাড়ি তারা করবেন না। আমি তার কোনো লক্ষণ দেখি না। কয়েকটা দল যা শুরু করেছে, এটা না হলে নির্বাচন হবে না, ওইটা না হলে নির্বাচন হবে না। যদি এগুলো হতে থাকে, তাহলে নির্বাচন কেমন হবে? কেউ কেউ বলেই ফেলেছেন, নির্বাচনে যাব না। কয়েক দিন আগে হইলেন, নির্বাচনে গেলেই কি আর না গেলেই কি।’

নির্বাচন আর সংস্কার বিষয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আজ একটা অবস্থা এসেছে, দেশের নির্বাচন না সংস্কার। নির্বাচন না সংস্কার যদি আলাপ করি, অনেক লম্বা আলাপ হবে। ছোট একটা কথা জানেন? নির্বাচনের বিকল্প শুধু নির্বাচনই হতে পারে। অন্য কিছু হতে পারে না। এখন আমি বুঝি না, আমি কথা বললেই বলবে, মির্জা আব্বাস সংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলে। সংস্কার চায় না। আরে ভাই না। আমাদের জন্য, নির্বাচনের জন্য, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য যে সংস্কারটুকু প্রয়োজন, আমরা সেই সংস্কারটুকু চাই। কোন সংস্কার চাই? যেটা দেশের মানুষের জন্য প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় সংস্কার, যেটা আরও বিপদ ডেকে আনবে, এমন সংস্কার আমাদের প্রয়োজন নেই।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশে কিছু সরকারি সাংবাদিক আছে, তাদের সরকারে না নিয়ে এই গভর্নমেন্ট ভুল করে ফেলছে আরকি। উচিত ছিল, তাদের সরকারে নেওয়া। তারা আবার খুব ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। আমার বক্তব্যগুলো কাটপিস করে এমনভাবে জনগণের সামনে হাজির করা হয়, যাতে জনগণ আমার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়। এজন্য এখন বক্তব্য দিতে খুব হিসাব করতে হয়। আজকে যখন এখানে বসেছি, কথা বলছি, দেশের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। আমরা ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি। এই ১৭ বছরে বিএনপির প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী নিহত হয়েছেন, পাঁচ হাজারের বেশি কর্মী গুম-খুন হয়েছেন, আমাদের জেল খাটতে হয়েছে বছরের পর বছর, মাসের পর মাস।’

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘কিন্তু আমি একবার বলেছিলাম, আপনারা যে সংস্কার চাইছেন, সব সংস্কার তো মানা যাবে না। এই কথা টুইস্ট করে আমাদের কয়েকজন বিদেশে অবস্থানরত তথাকথিত সাংবাদিক টুইস্ট করে এমনভাবে বললেন, বিএনপি সংস্কার চায় না, মির্জা আব্বাস সংস্কার চায় না। এমনকি সালমান রহমানের টাকা খেয়ে যার স্বাস্থ্য চেহারা মোটা হয়েছে, এমন লোকটা প্রায়ই আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে আসেন। উনি প্রায়ই বলেন, কেন মানবেন না? আপনাদের কি স্টেক আছে, কেন মির্জা আব্বাস এটা মানবেন না? তোমার যেমন বিদেশে পালায় থেকে কথা বলার অধিকার আছে, আমার কি দেশে থেকে কথা বলার অধিকার নেই? আপনারা তো পালায় গিয়ে লম্বা লম্বা কথা বলছেন, কোনো দিন দেশে আসবেন না।’

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘যারা দেশের বাইরে ইউটিউবার আছেন, সম্মান রেখেই বলতে চাই, আমরা রাজনীতি ছেড়ে দেব। আপনারা দেশে আসেন। আপনাদের অনেক জ্ঞান, অনেক বুদ্ধি। আপনাদের জ্ঞান বুদ্ধি অনেক প্রয়োজন। দয়া করে দেশে আসেন, বুদ্ধি দেন, কথা বলেন, কাজ করেন, মেনে নেব। আমরা রাজনীতি করব না, ছেড়ে দেব। দেশে আসবেন না, আবার টিটকারি মেরে কথা বলবেন, সমালোচনা করবেন, জাত-গুষ্ঠি উদ্ধার করবেন, এটা কেমন কথা? মিথ্যা কথা বলবেন, অপপ্রচার করবেন, অকথা, কুকথা বলবেন, একটা মানুষের চরিত্র হনন করবেন, এগুলো কী? যারা ফেসবুক চালান, তারা এগুলোর জবাব দিয়ে দেবেন। সোজা হয়ে যাবে।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘খেয়াল করলাম, এনসিপির (নতুন আত্মপ্রকাশ করা দল) এক ছেলে বলে ফেলল, এখন নির্বাচন করা সম্ভব নয়। কারণ, প্রশাসনের সব জায়গায় বিএনপির লোক বসা আছে। ১৭ বছর আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করল, বিএনপির লোক কই পাইলেন, আমি তো বুঝলাম না। ১৭ বছরে বিএনপির লোক মইরা ভূত হয়ে গেছে। একটাও নেই। আপনারা বলেন সব বিএনপির লোক প্রশাসনে বসে আছে। এসব কথা নেহাতই বাচ্চাদের মতো করে বলছেন। দেশটাকে আরেকবার মুক্ত করেন না। প্রশাসনে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, সচিবালয়ের ভেতর দেশের যে শত্রুগুলো বসে আছে, আওয়ামী লীগের দালাল বসে আছে, তাদের কেন আপনারা বের করেন না? যদি বলি তাদের কাছ থেকে আপনারা অবৈধ সুবিধা পাচ্ছেন।’

অনেকে বলেন, আগে বিচার করতে হবে, পরে নির্বাচন এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আপনারা তো আমাদের চাইতে বেশি অত্যাচারিত না। ৫ আগস্টের কথা যদি বলেন...৪ আগস্ট আমাদের মনে আছে না? আমি তো নিজে রাজপথে ছিলাম। নিজে কাকরাইল মোড়ে ছিলাম, টিয়ার শেলের মুখে। আমাদের ৪৬২ জন ছেলে মারা গেল, ৩০ হাজারের মতো আহত হলো। আমাদের কোনো অবদান নেই? অনেকে বলে, আপনারা সারেন্ডার করে ঘরে ঢুকে গেছিলেন। যদি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা, ইসলামী ছাত্রশিবির কিংবা বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল না বের হতো, তাহলে কী অবস্থা দাঁড়াত। কৃতিত্বের দাবিদার একা হওয়ার চেষ্টা করবেন না। ক্ষতি হবে দলের ও দেশের। দেশটা খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে। দেশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। দেশকে বিভক্ত করা গেলে আবার এ দেশকে ভারতীয় আধিপত্যের হাতে চলে যেতে হবে।’

গণতন্ত্র ফোরামের সভাপতি ভি পি ইব্রাহিমের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আবদুস সালাম আজাদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য দেন।

এদিকে গতকাল দুপুরে মানিকগঞ্জের গড়পাড়ায় বর্ষবরণের আনন্দ শোভাযাত্রার মোটিফ তৈরি করা চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ি পরিদর্শনকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সব গণতন্ত্রকামী মানুষ আপনাদের (অন্তর্বর্তী সরকার) সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আইনগতভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো ভিত্তি নেই। যারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে, তারা প্রত্যেকেই আপনাদের সমর্থন করেছে, সে অনুযায়ী আপনারা দেশ চালাচ্ছেন। এখন আওয়ামী লীগ কীভাবে রাজনীতি করবে সে দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের। কারণ প্রশাসন আপনাদের হাতে, অন্য সব স্টেট মেশিনারি আপনাদের হাতে। আওয়ামী লীগকে নিয়ে আপনারা কী করবেন সেটা আপনাদেরই ঠিক করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দোসরদের অনুসারীরা ঘাপটি মেরে আছে বিভিন্ন তৃণমূলে, সমাজের নানা জায়গায়। ওদের কাছে পেট্রোল কিনে বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার যে অর্থ, মানুষকে হত্যা করার জন্য যে অস্ত্র লাগে তা আছে। সেটাকে দমন করতে আপনাদের (অন্তর্বর্তী সরকার) কী আইন প্রণয়ন করতে হবে, সেটা আপনারা জনগণের কাছে খোলাসা করুন। আওয়ামী লীগের অনেকেই পালিয়ে গেলেও যারা নৈরাজ্য ছড়াচ্ছে তারা কার কাছে প্রশ্রয় পাচ্ছে?’

মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আজাদ খান, গোলাম আবেদীন কায়সার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।