ইসলামের ইতিহাসে যাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তাদের মধ্যে অন্যতম হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি ছিলেন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ঠ সাহাবি, দ্বিতীয় খলিফা এবং ইসলামি খেলাফতের ভিত্তিমূল দৃঢ় করে দেওয়া এক মহান শাসক। খলিফা হিসেবে তার শাসনকাল ছিল ১০ বছর ৬ মাস, যা ইসলামের ইতিহাসে সুবিচার, প্রশাসনিক দক্ষতা, জ্ঞানের ব্যাপকতা ও খোদাভীতি চর্চার জন্য যুগান্তকারী সময় হিসেবে গণ্য।
হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এমনই একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক ও শাসক, যার নাম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিস্ময়ের সঙ্গে উচ্চারিত হয় আজও। তার চিন্তা, কর্মপদ্ধতি ও নীতি আজও বিশ্বের বহু দেশে রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন আলাদা এক পাঠশালা। সাহসিকতা, নেতৃত্ব, বিচক্ষণতা, খোদাভীতি ও ন্যায়পরায়ণতা সব গুণই যেন একত্র হয়েছিল তার মধ্যে। তিনি খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মজবুত সঙ্গে সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ ও প্রশাসনিক শুদ্ধাচারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।
প্রারম্ভিক জীবন : হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরাইশ গোত্রের বনি আদি শাখার অন্তর্গত। তিনি ছিলেন জাহেলি যুগে মক্কার গণ্যমান্য নেতা ও সমাজপতি। তার পিতার নাম খাত্তাব এবং মায়ের নাম হান্তামা। শৈশবেই তিনি ঘোড়সওয়ারি, কুস্তি ও ভাষণদানে পারদর্শিতা অর্জন করেন। স্বাভাবিকভাবেই তার চরিত্রে ছিল দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও নেতৃত্বগুণ।
ইসলাম গ্রহণ : ইসলামের শুরুর যুগে একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার জন্য ওমর (রা.) রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে সেই পথেই ঘটল তার হৃদয়োন্মোচন। যখন তিনি তার বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা জানতে পারেন এবং তাদের ঘরে গিয়ে কোরআন তেলাওয়াত শুনেন, তখন কোরআনের অলৌকিক ভাষা ও তাওহিদের আহ্বানে তিনি অভিভূত হন। সঙ্গে সঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল ইসলামের বিজয়ের সূচনা।
ইসলামের শক্তি ও সাহসের প্রতীক : হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের আগে মুসলমানরা গোপনে নামাজ আদায় করতেন, ইসলামের দাওয়াতও ছিল সীমাবদ্ধ। কিন্তু তিনি মুসলমান হওয়ার পরই প্রথমবার মুসলমানরা প্রকাশ্যে ইবাদত করেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মহান আল্লাহ ওমরের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তি দান করেছেন।’ তিনি ছিলেন একাধারে সাহসী ও তাকওয়াবান মানুষ।
খেলাফতের দায়িত্ব : হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুশয্যায় থাকার সময় হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মুসলিম উম্মাহর খলিফা মনোনয়ন দেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রথমেই তার মনোনয়নের ব্যাপারে উম্মতের মতামত নিয়ে নিশ্চিত হন। এই সিদ্ধান্ত যে সময়োপযোগী ও সঠিক ছিল, তা প্রমাণ করেছে তার শাসনকাল।
শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক দক্ষতা : হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসন ছিল সুবিচার, ন্যায়পরায়ণতা ও সুশৃঙ্খল প্রশাসনের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তিনি কয়েকটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এক. দেওয়ান বা প্রশাসনিক দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। দুই. হিজরি সন প্রবর্তন করেন। তিন. কাজি নিয়োগ করে বিচারব্যবস্থা পৃথক করেন। চার. বিভিন্ন প্রদেশে গভর্নর ও আমির নিযুক্ত করেন এবং তাদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন। পাঁচ. সরকারি ভাতা বা বায়তুল মালের সুব্যবস্থা করেন। ছয়. মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে সংগঠিত ও পারিশ্রমিক নির্ধারণ করেন। সাত. নগর পরিকল্পনা ও রাস্তাঘাট উন্নয়ন, মসজিদ নির্মাণ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে শহরের অবস্থা খতিয়ে দেখতেন, গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়াতেন, এমনকি নিজের কাঁধে খাদ্যের বস্তা তুলে নিতেন। তার ন্যায়পরায়ণতা এতটাই খ্যাত ছিল যে, তিনি নিজেই বলতেন, ‘ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায়, তবে আমি আল্লাহর কাছে দায়ী থাকব।’
বিজয় ও সম্প্রসারণ : হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয় পারস্য, সিরিয়া, মিসর, জেরুজালেমসহ বিশাল অঞ্চলে। কাদিসিয়া, যর্মুক, নেহাওয়ান্দ প্রভৃতি যুদ্ধ বিজয়ের মাধ্যমে পারস্য সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বিপর্যস্ত হয়। তবে তার এই বিজয় ছিল মানবাধিকার, শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য, কোনোরূপ নিপীড়নের জন্য নয়।
ধর্মীয় সহনশীলতা ও প্রশাসনিক সাম্য : বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের সময় তিনি খ্রিস্টান নেতাদের সঙ্গে চুক্তি করেন, যাতে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা এবং জীবন-সম্পত্তির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এই চুক্তি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মীয় সহনশীলতার একটি শ্রেষ্ঠ দলিল।
ব্যক্তিত্ব ও খোদাভীতি : হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের প্রতিটি দিকেই ছিল তাকওয়া ও খোদাভীতির ছাপ। তিনি নিজে ক্ষুধার্ত থাকতেন, কিন্তু উম্মতের কষ্ট সহ্য করতেন না। তিনি বলতেন, ‘যদি আমার উম্মতের কেউ ক্ষুধায় কষ্ট পায়, তবে আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারি না।’ মানুষ হিসেবে তিনি কঠোর ছিলেন, কিন্তু হৃদয় ছিল কোমল। সত্যের প্রশ্নে কখনো আপস করতেন না। কারও মুখ দেখে বিচার করতেন না।
শাহাদাত : ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে আবু লুলু নামে এক ক্রীতদাস ফজরের নামাজের সময় হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ছুরিকাঘাত করে। তিনি মৃত্যুপথে থেকেও তার খলিফা নির্বাচনে পরামর্শ কমিটি গঠন করেন, কাউকে নির্দিষ্ট করে মনোনয়ন দেননি। এর মধ্য দিয়ে তিনি শাসনব্যবস্থার দলীয়করণ বা উত্তরাধিকারভিত্তিক হস্তান্তর প্রতিরোধ করেন।