মিলছে বজ্রপাতের পূর্বাভাস, তবুও মৃত্যু

মাসের শেষে তাপমাত্রা বাড়লে কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাতও বৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল। যথারীতি বজ্রপাতে গতকাল  সোমবার একদিনে পাঁচ জেলায় ৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এতে এ পর্যন্ত  মৌসুমে ২২ জনের মৃত্যু হলো। ২০১৬ সাল থেকে দেশে দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া বজ্রপাতে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জনের মৃত্যু হচ্ছে। আর এই মৃত্যুহার কমাতে এবার আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাস পদ্ধতি চালু করেছে। দেশের কোন এলাকায় কত বেগে ঝড় বইবে এবং কখন বজ্রপাত হবে সেই পূর্বাভাস দিচ্ছে এক থেকে চার ঘণ্টা আগে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস ব্যবস্থায় তা নতুন এক সংযোজন উল্লেখ করে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এতদিন অবস্থান ও সময়ভিত্তিক বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে পারতাম না। গত ১ এপ্রিল থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থায় বজ্রপাতের পূর্বাভাস পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায়ও তা প্রচার করা হচ্ছে। এতে স্থানীয়ভাবে মানুষ সচেতন হবে এবং বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসবে।’

তবে এই পূর্বাভাস পদ্ধতি অবশ্যই স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে উল্লেখ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা) নিতাই চন্দ্র দে সরকার বলেন, ‘ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে এবং তা কিভাবে পৌঁছানো যায় তা নিয়ে আমরাও কাজ করছি।’

কিভাবে দিচ্ছে এই পূর্বাভাস : আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, আমরা রাইমসের (রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ফর আফ্রিকা অ্যান্ড এশিয়া) এর কারিগরি সহায়তায় বজ্রপাতের পূর্বাভাস প্রকাশ করছি। বাইসালা ও আর্থ নেটওয়ার্কিং সিস্টেমের মাধ্যমে বজ্রপাতের তথ্য সংগ্রহ করে এবং স্যাটেলাইট উপাত্ত ব্যবহার করে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছে এই পদ্ধতি। আমরা এখন জেলা পর্যায়ে এক থেকে চার ঘণ্টা আগেই জানিয়ে দিচ্ছি বজ্রপাতের পূর্বাভাস। আগামীতে উপজেলা পর্যায়েও যাতে নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া যায় সে লক্ষ্যে কাজ চলমান রয়েছে। বজ্রপাত নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা করা অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ান বলেন, ‘যাদের জন্য এই পূর্বাভাস তাদের কাছে তা পৌঁছাতে হবে।

এই পূর্বাভাস ব্যবস্থা তৈরিতে কাজ করতে থাকা রাইমসের ওয়েদার এক্সপার্ট খান মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আমরা আর্থনেটওয়ার্ক ও বাইসালা থেকে বজ্রপাতের বর্তমান অবস্থা নেই এবং জাপানের হিমোরি-৯ স্যাটেলাইট থেকে মেঘের তাৎক্ষণিক অবস্থার উপাত্ত একত্রিত করে একটি প্রোগ্রাম সেট করেছি। সেই প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিচ্ছি।’

বজ্রপাত কখন হয় : আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত ভোরের দিকে এবং বিকেলে বজ্রপাত বেশি হয়ে থাকে।’ খান মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, দেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা এলাকায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় এবং এসব এলাকার মানুষও বেশি মারা যায়। তিনি বলেন, সিলেটের পাহাড়ি এলাকাগুলো জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উঠে এবং সেখানে ঘনীভূত হয়ে জলীয়বাষ্পের সৃষ্টি করলেও বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। একইসঙ্গে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওর এলাকায় জলীয়বাষ্প বাষ্পীভূত হয়ে বজ্রপাতের সৃষ্টি করে।

আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, সারা বিশ্বে দিন ও রাতের যেকোনো সময়ে বজ্রপাত হলেও আমাদের দেশে ভোরে ও বিকেলে বেশি হয়ে থাকে। মূলত তাপমাত্রা ও জলীয়বাষ্পের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বজ্রপাত সৃষ্টি হয়ে থাকে।

 দেশে সাধারণত মার্চ থেকে মে মাসে প্রায় ৫৯ শতাংশ, আর মৌসুমি বায়ু আসার সময়, অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬ শতাংশ বজ্রপাত হয়। তবে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ হয় এপ্রিল থেকে জুনে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশে আসার আগের দুই মাসে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও  মৌলভীবাজারে বজ্রপাতের প্রকোপ অন্য জেলার তুলনায় অনেক বেশি হয়। বর্ষাকালে রাঙ্গামাটি, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামে বজ্রপাত সংঘটিত হয়। এ ছাড়া শীতকালে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট আর শীতের শেষে রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়।

বজ্রপাতে কারা বেশি মারা পড়ছে : ঘরের ভেতরে যারা থাকে তারা এই বজ্রপাতে মারা যায় না। খোলা আকাশের নিচে থাকলেই বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। আর খোলা আকাশের নিচে থাকে আমাদের শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকরা।

আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ জন্যই সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা, বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, নদীর চর এলাকা, নদীর আইল বা সাগরের পার এলাকায় যেখানে উঁচু কোনো স্থাপনা বা বৃক্ষ নেই সেসব এলাকায় বজ্রপাতের সময় মানুষ থাকলে তারা মৃত্যুঝুঁকিতে থাকেন।

বজ্রপাতে ২০১৫ থেকে ৩,৫০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে : ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে এই ঘোষণাতে মৃত্যুহারের সংখ্যায় কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে এই বজ্রপাতে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ) নিতাই চন্দ্র দে সরকার বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে বজ্রপাতে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে চলতি মৌসুমে গতকাল পর্যন্ত এ মৌসুমে ২২ জন মারা গেছে। বজ্রপাতে মারা যাওয়াদের মধ্যে বেশিরভাগই কৃষক।’