ইসলামে শ্রমিকের অধিকার

শ্রমিকের অধিকারের ব্যাপারে ইসলাম যে রূপরেখা দিয়েছে তা কেয়ামাত পর্যন্ত শ্রেষ্ঠত্বের আসনে থাকবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা মজুরের শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দেবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ) মজুরের মজুরি নির্ধারণ না করে তাকে কাজে নিযুক্ত করতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি) এভাবে ইসলাম শ্রমিকের অধিকারের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদের সার্বভৌমত্ব ও মালিকানা মহান আল্লাহর, আর মানুষ তার তত্ত্বাবধায়ক মাত্র। সুতরাং এখানে মালিক-শ্রমিক সবাই ভাই ভাই। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে শ্রদ্ধা-স্নেহ, সৌহার্দ্য ও বিশ্বস্ততায় ভরপুর। শ্রমিক ও মালিক উভয়ের অধিকার রয়েছে নিজ নিজ প্রাপ্য বুঝে পাওয়ার। উভয়কে বলা হয়েছে নিজ নিজ কর্তব্য পালনে দায়িত্বশীল হতে। শুধু মালিক বা শুধু শ্রমিক নয়; বরং উভয়কে সুসংহত আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।

ইসলাম শ্রমের শ্রেণিবিন্যাসকে স্বীকার করলেও মানবিক মূল্যবোধ এবং মৌলিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সবাই সমান। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যবসা, কৃষি ও দ্বীন চর্চায় উৎসাহিত করেছেন। আবার মর্যাদার ক্ষেত্রে সব শ্রমিক সাধারণভাবে সমান ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শ্রমজীবী আল্লাহর বন্ধু। আর ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে বহু নির্দেশনা রয়েছে। শ্রমের প্রতি উৎসাহ দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ পূর্ণ করা হবে, তখন জমিনে ছড়িয়ে পড়ো। আর আল্লাহকে অধিক মাত্রায় স্মরণ করো। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত ১০)

হাদিস শরিফে এসেছে, ‘ফরজ ইবাদতগুলোর পরই হালাল উপার্জন করা ফরজ দায়িত্ব।’ (জামে তিরমিজি) হাদিস শরিফে আরও এসেছে, ‘হালাল উপার্জনগুলোর মধ্যে তা সর্বোত্তম, যা কায়িক শ্রম দ্বারা অর্জন করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম) শ্রমিকের অধিকার ও শ্রমগ্রহীতার কর্তব্য সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে, ‘শ্রমিকরা তোমাদেরই ভাই, মহান আল্লাহ তাদের তোমাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। মহান আল্লাহ যার ভাইকে তার দায়িত্বে রেখেছেন, সে যা খাবে তাকেও তা খাওয়াবে, সে যা পরিধান করবে তাকেও তা পরিধান করাবে। তাকে এমন কষ্টের কাজ দেবে না যা তার সাধ্যের বাইরে, কোনো কাজ কঠিন হলে সেই কাজে তাকে সাহায্য করবে।’ (সহিহ মুসলিম)

হজরত শুআইব (আ.) হজরত মুসা (আ.)-কে কাজে নিয়োগ দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে কষ্টে ফেলতে চাই না। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে কল্যাণকামী হিসেবে পাবেন।’ (সুরা কাসাস, আয়াত ২৭) হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক লোক এসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ভিক্ষা চাইলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি কিছুই নেই? সে বলল, আমার একটি কম্বল আছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যাও কম্বলটি নিয়ে এসো। কম্বল নিয়ে এলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা নিলামে বিক্রয় করলেন দুই দিরহাম মূল্যে। এক দিরহাম তাকে দিয়ে দিলেন পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে আর এক দিরহাম দিয়ে কুড়াল কিনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তাতে হাতল লাগিয়ে দিলেন, আর ওই লোককে কাঠ কেটে উপার্জন করার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি)

প্রায় সব নবী-রাসুলই কায়িক পরিশ্রম করে জীবিকা উপার্জন করেছেন। দ্বিতীয় আদম হজরত নুহ (আ.) কাঠমিস্ত্রি বা সুতারের কাজ করেছেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) সেলাইয়ের কাজ করতেন। হজরত সুলাইমান (আ.)-এর পিতা নবী ও সম্রাট হজরত দাউদ (আ.) লৌহশিল্প বা কামারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এমনকি নবী হজরত শুআইব (আ.)-এর খামারে হজরত মুসা (আ.) ৮ বছর চাকরি করেছেন। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ও মা খাদিজা (রা.)-এর কোম্পানিতে চাকরি করেছেন।

পারিশ্রমিকের ব্যাপারে হাদিস শরিফে আছে, ‘তোমরা শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করো তার ঘাম শুকানোর আগেই।’ (সুনানে বায়হাকি, মিশকাতুল মাসাবিহ) যারা শ্রমিকের মজুরি আদায়ে টালবাহানা করে, তাদের ব্যাপারে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সামর্থ্যবান মালিকের জন্য পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম বা অবিচার।’ (সহিহ বুখারি) ‘হাশরের দিনে জুলুম অন্ধকার রূপে আবির্ভূত হবে।’ (সহিহ মুসলিম) হাদিসে কুদসিতে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আমি তাদের বিরুদ্ধে থাকব, যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে, মানুষকে বিক্রি করে এবং ওই ব্যক্তি যে কাউকে কাজে নিয়োগ করল, অতঃপর সে তার কাজ পুরোটা করল; কিন্তু সে তার ন্যায্য মজুরি দিল না।’ (সহিহ বুখারি)

হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যদি কেউ কারও ন্যায্য পাওনা অস্বীকার করে, মহান আল্লাহ তার জন্য বেহেশত হারাম করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম) ইসলামি বিধানমতে নিম্নতম মজুরি হলো শ্রমিকের মৌলিক অধিকারগুলো তথা খোরপোষ-বাসস্থান এবং শিক্ষা ও চিকিৎসা।’ (সহিহ বুখারি) ক্ষতিগ্রস্ত বা অক্ষম শ্রমিক এবং তার পরিবারের ব্যাপারে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যারা সম্পদ রেখে যাবে, তা তাদের উত্তরাধিকারীরা পাবে আর যারা অসহায় পরিবার-পরিজন রেখে যাবে, তা আমাদের (সরকার ও মালিকপক্ষের) দায়িত্বে।’ (সহিহ বুখারি)

পরিশেষে বলতে চাই, অসংখ্য কোরআনের আয়াত ও হাদিস শরিফে শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যাবে। কিন্তু কথা হচ্ছে আমাদের সমাজে এর বাস্তবায়ন কোথায়? ইসলামের এই কথাগুলো বর্তমানে অমুসলিম বহু দেশে পালন করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু মুসলিমপ্রধান দেশে এর সামান্যই খুঁজে পাওয়া যাবে। একজন শ্রমিকের যে অধিকার কোরিয়া, জাপান বা ইউরোপ-আমেরিকায় দেওয়া হয় তার সামান্যও যদি বাংলাদেশে দেওয়া হতো তাহলে এখানের শ্রমিকরা অনেক ভালো থাকতে পারত। আমাদের দেশে দিন দিন মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে বৈষম্য বেড়েই চলেছে। যত সামান্য পারিশ্রমিকে শ্রমিক রাখা যায় সেই চেষ্টা করা হয়। একজন শ্রমিক কোরিয়া বা জাপানে যে কাজ করে দুই লাখ টাকা উপার্জন করতে পারে একই পরিশ্রম করে বাংলাদেশে বিশ হাজার টাকা উপার্জন করা যায় না। তা ছাড়া একটা মুসলিম দেশে কোনো শ্রমিক তার মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কোনো সহজ কাজ নয়। যেকোনো সময় মালিক তার শ্রমিককে কারণ দর্শানো ছাড়াই চাকরিচ্যুত করতে পারে। কোরিয়া, জাপান বা যেকোনো শ্রমিকবান্ধব অমুসলিম দেশে একজন শ্রমিক বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পায় এবং যেকোনো সময় মালিকের অন্যায় আচরণের প্রতিকার করতে পারে। ইসলাম যে সাম্যের শিক্ষা দিয়েছে তার বাস্তবায়ন কিছুটা হলেও এসব অমুসলিম দেশে আছে। অথচ আমরা মুসলিম হিসেবে আমাদের জীবনেই এর সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ ও প্রতিফলন হওয়া উচিত ছিল। কেবল বড় বড় ফ্যাক্টরি শিল্প কল-কারখানা নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ঘরের কাজের মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও আমাদের মুসলিমদের আচরণ আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দান করুন। আমিন।