মিসরের প্রাচীন নগরী কায়রোর সিটাডেলে দাঁড়িয়ে আছে আভিজাত্যে ভরা এক অনন্য স্থাপত্য মুহাম্মদ আলি মসজিদ। এর উঁচু মিনার, চোখ ধাঁধানো গম্বুজ এবং শ্বেতাভ দেয়ালে সূর্যের ঝলমলে আলোর খেলা যেন এক নান্দনিক শিল্পের চলন্ত চিত্র, যার দর্শন হৃদয়কে মুহূর্তেই মোহনীয় করে তোলে। ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই মসজিদে। মসজিদটি শুধুই ইবাদতের স্থান নয়, বরং ওসমানি খেলাফতের নীরব এক সাক্ষী।
১৮০৫ সালে মিসরের শাসক হিসেবে ক্ষমতায় আসেন মুহাম্মদ আলি পাশা। ১৮১১ সালে তিনি মামলুক শাসকদের চূড়ান্তভাবে নির্মূল করে এক নতুন প্রশাসনিক যুগের সূচনা করেন। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সংস্কারমূলক পদক্ষেপ এবং সামরিক আধিপত্য এক নতুন মিসর নির্মাণের ঘোষণা দেয়। এই নবযাত্রার প্রতীক হিসেবেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুহাম্মদ আলি মসজিদ’। নির্মাণ শুরু হয় ১৮৩২ সালে। আর নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৮৫৭ সালে তার পুত্র সাঈদ পাশার শাসনামলে।
মসজিদের নকশায় ওসমানি খেলাফতের প্রভাব সুস্পষ্ট। ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত সুলতান আহমেদ মসজিদের আদলে গড়ে তোলা হয় এই স্থাপত্য কাঠামোকে, যাতে মিসরীয় ঐতিহ্যের বিচ্যুতি ঘটে। তৎকালীন মিসরে প্রচলিত মামলুক স্থাপত্যশৈলীকে পেছনে ফেলে মুহাম্মদ আলি পাশা বেছে নিয়েছিলেন এক বৈশ্বিক ও আধুনিক রূপ, যেন তার আধিপত্য কায়রোর আকাশরেখা থেকেই জানান দেয়।
মসজিদের প্রধান গম্বুজের উচ্চতা ৫২ মিটার এবং ব্যাস ২১ মিটার। এর চারপাশে চারটি আধা-গম্বুজ এবং কোনায় আরও চারটি ছোট গম্বুজ যুক্ত হয়ে একটি কেন্দ্রীভূত গঠন তৈরি করেছে। বিশাল চারটি স্তম্ভ গম্বুজের ভার ধারণ করে আছে। মূল নামাজ কক্ষ প্রায় ৪৫ বাই ৪৬ মিটার আয়তনের। এই মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এতে অ্যালাবাস্টার পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের নিম্ন প্রাচীর ও প্রাঙ্গণ এই সাদা পাথরে মোড়ানো।
৫৫ বাই ৫৭ মিটার আয়তনের খোলা প্রাঙ্গণটি ঘিরে আছে খিলানসমৃদ্ধ বারান্দা ও গম্বুজ। কেন্দ্রস্থলে আছে একটি মার্বেল খোদাই করা ও কারুকার্যময় ফোয়ারা। দক্ষিণ ও পূর্ব কোণে অবস্থান করছে দুটি ৮২ মিটার উঁচু মিনার, যা ওসমানি স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। মূল নামাজ কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সোনালি অলংকরণ, বিস্তৃত ঝাড়বাতি এবং আরবি ক্যালিগ্রাফির মিশ্রণ। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে স্থাপনকৃত মিহরাব এবং তার পাশে মূল কাঠের মিম্বরটির খোদাই নজরকাড়া। ১৯৩৯ সালে বাদশাহ ফারুক অ্যালাবাস্টারে নির্মিত মিম্বর উপহার দেন, যা খুবই দৃষ্টিনন্দন। মসজিদের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে মুহাম্মদ আলি পাশার সমাধি। ইতালির ক্যারারা মার্বেলে নির্মিত সাদা সমাধি মঞ্চটিকে ঘিরে আছে ব্রোঞ্জের খোলা জালি। সমাধিটি বানিয়েছিলেন তারই নাতি আব্বাস।
১৯৩১ সালে বাদশাহ ফুয়াদের নির্দেশে একটি প্রকৌশল কমিটি গঠন করা হয়, যা বিশাল গম্বুজ ও অন্যান্য গঠনসমূহের সংস্কার শুরু করে। ৬৫০ টন স্টিলের কাঠামো ব্যবহার করে পুরনো গম্বুজ ভেঙে একই আকারে পুনর্নির্মাণ করা হয়। ব্যয় হয় প্রায় এক লাখ মিসরীয় পাউন্ড। ২০১২ সালে কার্পেট সংযোজন, ২০১৪-১৭ সালে ঘড়ি টাওয়ার ও অভ্যন্তরের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার কাজ চলে। প্রতিটি ধাপে প্রাচীন রূপকে রক্ষা করাই ছিল মূল লক্ষ্য।