আতঙ্কে সীমান্তের দুদিকের মানুষ

জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার পারদ বেড়েই চলেছে। দুদেশই নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও ঐতিহাসিক সিন্ধু চুক্তি স্থগিতসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। সেই সঙ্গে দুদেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। এমন অবস্থায় কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখার (এলওসি) দুই পাশের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সীমান্তের দুপাশেই মানুষ আতঙ্ক থেকে বাংকার সংস্কার করছে।

আতঙ্কে সাধারণ মানুষ : পেহেলগামে হামলার পর থেকেই কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারত ও পাকিস্তানের সেনাদের মধ্যে নিয়মিতভাবেই গোলাগুলি চলছে। যে কারণে বিনিদ্র রাত কাটছে এলওসির কাছাকাছি এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের। ভারতশাসিত কাশ্মীরের উরি সেক্টরের তুতমার গলি পোস্ট এবং পাকিস্তানশাসিত লিপা সেক্টরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর বেশ কয়েকবার গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। তবে এখনো পর্যন্ত ওই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবুও অজানা আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে সীমান্ত পাড়ের মানুষদের। পাকিস্তানশাসিত লিপা উপত্যকার বাসিন্দা এহসান-উল-হক শামি পেশায় একজন আইনজীবী। ওই অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাড়ি তার। শামি বলেন, শুক্রবার মধ্যবর্তী রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে গুলিবিনিময় চলে।

তিনি আরও বলেন, যদিও এখনো সাধারণ মানুষকে নিশানা হতে হয়নি, কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সবার মধ্যেই আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক গুলিবিনিময়ে ২০১৯ সালে শামির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারও আগে ২০০২ ও ১৯৯৮ সালেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের বাড়ি।

ভারতশাসিত কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা উত্তর কাশ্মীরের কুপওয়ারা ও বারামুল্লা জেলায় অবস্থিত। কুপওয়ারায় এখনো পর্যন্ত সীমান্তে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেনি। তবে অতিরিক্ত সামরিক তৎপরতা এবং রাতের আকাশে বোমারু বিমানের আওয়াজ নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি বাস করা মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। গত শুক্রবার কুপওয়ারার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এক নির্দেশ জারি করে জানিয়েছিলেন, কুপওয়ারার নিয়ন্ত্রণরেখা-সংলগ্ন অঞ্চলে যেতে হলে আগাম অনুমতি নিতে হবে। তবুও দুদেশের মধ্যকার এই উত্তেজনা থেকে কুপওয়ারার কারনাহ সেক্টরের বাসিন্দারা ব্যক্তিগত ব্যয়ে ভূগর্ভস্থ বাংকার তৈরির কাজ শুরু করেছেন বা সেগুলো পুনর্নির্মাণ করছেন। তেমনই একজন পীরজাদা সৈয়দ, যিনি পহেলগামের ঘটনার পর সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির নিচে বাংকার তৈরির কাজ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘সীমান্তে গোলাগুলির পরিণতি আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। এর ভয়াবহতা আমরা জানি। সে কারণেই আমরা ভূগর্ভস্থ বাংকার বানাচ্ছি, যাতে কিছু হলে আমরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারি।’ কুপওয়ারার নিয়ন্ত্রণরেখার জিরো লাইনে অবস্থিত টোড গ্রামের এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, ‘২০১৭ সালে যখন গোলাবর্ষণ হচ্ছিল, তখন আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে একটা শেল এসে পড়েছিল এবং তখনই তার মৃত্যু হয়। ২০২১ সালে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হলে চার বছর ধরে জীবন শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু এখন আশঙ্কা হচ্ছে, আগের মতো পরিস্থিতি হয়তো ফিরে আসতে পারে।’

পীরজাদা সৈয়দ আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে যখন আমাদের বাংকার তৈরি রাখার কথা বলা হয়, তখন সবাই হতবাক হয়েছে। কিন্তু বাঁচতে হবে, তাই সবাই বাংকার পরিষ্কার করতে বা সেগুলো পুনর্নির্মাণ করতে শুরু করে দিয়েছে।’

পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের লিপা উপত্যকার বাসিন্দা শামি বলেন, ‘যখনই পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়, তখন নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ নিশানায় পরিণত হয়। শুক্রবার গোলাগুলি শুরু হলে প্রথমে আমি আমার বৃদ্ধ মাকে বাংকারে সরিয়ে নিয়ে যাই। তার বয়স হয়েছে এবং তিনি হাঁটাচলা করতে অক্ষম।’ শামি জানিয়েছেন, ওই এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ভূগর্ভস্থ বাংকার রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আমি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে বাংকারে পরিষ্কার করেছি, যাতে গোলাগুলি চললে এটা ব্যবহারের উপযোগী থাকে।’ এহসান-উল-হক শামি জানিয়েছেন, তাদের বাংকারগুলো এমনিতে মজবুত কিন্তু সব ধরনের বিপদ এড়াতে তা সক্ষম নয়। তিনি বলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে এটা বুলেট বা গোলা থেকে রক্ষা করতে পারলেও ভারী অস্ত্রের শেল সরাসরি বাংকারে পড়লে সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণে আশঙ্কা থেকে যায়, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেই পারি। অবশ্য এমনিতেই গুলি চললে কারও পক্ষে ঘুমানো সম্ভব নয়। শামির মতো ওই অঞ্চলের অন্য বাসিন্দারাও বিনিদ্র রাতই কাটিয়েছেন। তার কথায়, প্রায় পুরো এলাকার মানুষই পুরো রাত জেগে ছিল। তারা একে অন্যের মঙ্গল কামনা করেছে।’ লিপা উপত্যকার আরেক বাসিন্দা বশির আলম জানান, সরকারি প্রকল্পের আওতায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বা দু-তিনটি বাড়ি মিলিয়ে একটা বাংকার বানানো হয়েছে।

ভারতনিয়ন্ত্রিত উরি সেক্টরেও নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় ভুগছেন মানুষ। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এই সেক্টরের ভাটগ্রান ও চরন্দা এলাকায় ১৬টা বাংকার নির্মাণ করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ ও জলের ব্যবস্থা নেই। ভাটগ্রানের বাসিন্দা মহম্মদ কুদ্দুস বলেন, ‘কেউ কেউ নিজের খরচে বাংকার তৈরি করেছেন, কিন্তু দরিদ্র মানুষরা যাবে কোথায়। এখন আমরা বাধ্য হয়েই এই বাংকারগুলো পরিষ্কার করব।’

নিয়ন্ত্রণরেখা : ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত ৩ হাজার ৩২৩ কিলোমিটার বিস্তৃত। এর মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীরের ৭৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত রয়েছে সীমান্ত, যাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের তরফে একে যুদ্ধবিরতি রেখা হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু দুদেশই সিমলা চুক্তির অধীনে একে নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলওসি বলে। জম্মু, সাম্বা, কাঠুয়াসংলগ্ন সীমান্তকে ভারত ‘ইন্টারন্যাশনাল বর্ডার’ বলে আখ্যা দেয়। আর পাকিস্তান সেটাকে ‘ওয়ার্কিং বাউন্ডারি’ বলে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক : ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে শিগগিরই বৈঠক হতে পারে বলে জানিয়েছে গ্রিস। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের ঘূর্ণায়মান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে দেশটি। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ বলেন, ‘সমস্ত বিকল্পই বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি তোলা অন্যতম। আমরা উপযুক্ত সময়ে সিদ্ধান্ত নেব।’ গ্রিসের রাষ্ট্রদূত ইভাঞ্জেলোস সেকেরিস সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। শিগগিরই নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে বৈঠক হবে।’ তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জমা পড়েনি। তবে এমন একটি আলোচনা মূল্যবান হতে পারে।

রাষ্ট্রদূত সেকেরিস বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে আমরাও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরাও অন্যদের সঙ্গে একমত যে উত্তেজনা প্রশমন ও সংলাপ জরুরি, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না চলে যায়।’ পেহেলগাম হামলার বিষয়ে সেকেরিস বলেন, ‘এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা নীতিগতভাবে সন্ত্রাসবাদের যেকোনো কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাই এবং এটিই আমরা করেছি। নিরীহ বেসামরিকদের ওপর এই জঘন্য হামলা অবশ্যই নিন্দনীয়।’ তিনি বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই গ্রিসের তুলনায় অনেক বড় রাষ্ট্র। তাই বিষয়টির মাত্রাও ভিন্ন। আমরা সংলাপ ও উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বানে অন্যদের সঙ্গে একমত।’