দেশে ফেরার চেয়েও সংবাদমূল্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার তুলনামূলক সুস্থ হয়ে ওঠা। লন্ডনে ৪ মাসের চিকিৎসায় অনেকটা ভালো বোধ করায় তার দেশে ফেরা বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আগেও চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরার সঙ্গে এবারের ফেরার মধ্যে বিস্তর ভিন্নতা রয়েছে। দেশের রাজনীতি এবং জনগণের কাছে এর বিবেচনা অন্য রকমের। কেবল রাজনৈতিক কারণেই টানা গত ৬-৭ বছর তার চিকিৎসা নিয়েও চলেছে ভোগান্তি। সঙ্গে অপমানসহ অপরাজনীতি। বিএনপির অবিরাম আন্দোলনেও নিশ্চিত করা যায়নি তার বিদেশে চিকিংসা। বিগত সরকারের তরফে হাই-প্রোপাগান্ডা ছিল, তার অসুস্থতা গুরুতর নয়। যতটুকু অসুস্থতা দেশেই চিকিৎসা সম্ভব। লিভারসহ নানা রোগ হয়েছে কেন? সরকারের শীর্ষ জায়গা থেকে এমন তির্যক-গিবতমূলক প্রশ্নও ছোড়া হয়েছে। বয়স তো ৮০, মরে মরে করে, মরে না কেন (!) খোদার আরশ কাঁপানো এমন মন্তব্য করতেও ছাড়া হয়নি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পলায়নের পর, খালেদা জিয়ার বন্দি জীবনের অবসান হয়। অনেকেরই অপেক্ষা ছিল, শেখ হাসিনা বা বিতাড়িত আওয়ামী লীগকে নিয়ে কী বলেন খালেদা জিয়া? তা শোনার ও দেখার। দেখা গেল, প্রতিক্রিয়ায় খালেদা জিয়া কোনো জেদ বা প্রতিহিংসা দূরে থাক, একবারের জন্যও শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করেননি। আওয়ামী লীগ সম্পর্কেও কিছু বলেননি। তিনি ছাত্র-জনতাকে আহ্বান জানিয়েছেন ধৈর্য ধরার। জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার। এর মাস পাঁচেক পর ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নেওয়া হয় লন্ডনে। সেখানে দ্য লন্ডন ক্লিনিকে ১৭ দিন চিকিৎসার পর ২৫ জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয় ছেলে তারেক রহমানের বাসায়। এরপর ছেলের বাসাতেই তার চিকিৎসা চলে। চিকিৎসায় শারীরিকভাবে আগের চেয়ে অনেকটা ভালো বোধ করায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত।
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার পরিপ্রেক্ষিত ছিল ঘনঘটায় ভরা। ছিলেন একেবারেই গৃহবধূ। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন তার স্বামী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন দুই ছেলেকে লালন-পালন ও ঘরের কাজেই সময় কেটেছে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তেমন যেতেন না। স্বামীর মৃত্যুর পর বাস্তবতা তাকে টেনে আনে দলের রাজনীতিতে। নেতাকর্মীদের আহ্বানে ধরতে হয় দলের হাল। ক্রমেই তিনি দল মাড়িয়ে দেশের রাজনৈতিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ান। স্বামীর মৃত্যুর পরপরই তার রাজনীতিতে অভিষেক হয়নি। ৩০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয় তখন খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে তখন ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন তিনি। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা। জিয়াউর রহমান পরবর্তী দলের হাল কে ধরবেন সেটি নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। বিএনপি নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যে কোন্দলও ছিল প্রবল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ৭৮ বছর বয়স্ক ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি পারছিলেন না। প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তার ‘চলমান ইতিহাস : জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’ বইতে লিখেছেন, সামরিক এবং শাসকচক্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় ছিল খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য খালেদা জিয়াই সে সময় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হতে পারতেন। কিন্তু তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আব্দুস সাত্তারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হলো। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ চেয়েছিলেন, বিচারপতি সাত্তার প্রেসিডেন্ট হোক। বিষয়টি নিয়ে তখনকার বিএনপিতে মতভেদ দেখা দেয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধানের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ হয়েছে। মওদুদ আহমদ লিখেছেন, ‘বেগম জিয়া যদি প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইতেন, তাহলে অন্য কারও প্রার্থী হওয়ার তখন আর প্রশ্ন উঠত না’। বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বার্ধক্য এবং দল পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষের কারণে তৎকালীন বিএনপির একাংশ খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি খালেদা জিয়ার তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না।
৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা নেন। ততক্ষণে রাজনীতিতে বিচারপতি সাত্তারের আর কোনো মূল্যও থাকেনি। তার বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং নিষ্ক্রিয়তার কারণে দল থেকে তিনি আড়ালে পড়ে যান। এর আগেই একটা পর্যায়ে ঠিকই দলে ঐক্যের প্রয়োজেন ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন। পরের বছর মার্চে তিনি হন দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অসুস্থ হলে ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি তাকে করা হয় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন। বিচারপতি সাত্তারের মৃত্যুর পর সেই বছরের ১০ মে চেয়ারপারসন পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। কারাভোগসহ নানা ঘাত-প্রতিঘাত, নির্যাতন সঙ্গী করে এ দায়িত্বে আছেন টানা চার দশক। বিএনপির দায়িত্ব নেওয়ার পরই নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েন বেগম খালেদা জিয়া। তারপরও দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন কঠিন আন্দোলন। পান আপসহীন-দেশনেত্রীর খ্যাতি। এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে কোনোরকম সমঝোতা না করেই আন্দোলন করে গেছেন। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলেও বর্জন করে বিএনপি। যা দেশবাসীর কাছে আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৮৭ সাল থেকে বেগম খালেদা জিয়া এরশাদ হটাও এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। ওই আন্দোলন থেকে এক পর্যায়ে পিছু হটেন শেখ হাসিনা। এরশাদের অধীনে যে নির্বাচনে যাবে সে হবে জাতীয় বেইমান, নিজের দেওয়া এ ঘোষণার খেলাপ করেন তিনি নিজেই। এরশাদের পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়ে হন বিরোধীদলীয় নেত্রী। আওয়ামী লীগকে অনুসরণ করে জামায়াতে ইসলামীও। তাদের দেওয়া হয় ১০টি আসন। স্বাধীন বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে সেটাই জামায়াতের নিজ পরিচয়ে প্রথম অভিষেক। ওই অবস্থায় খালেদা জিয়াকে একাই এগিয়ে আনতে হয় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এতে তার রাজনৈতিক অভিযাত্রায় যোগ হয় বড় ব্যবধানের উচ্চ নম্বর। একটানা নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো হন দেশের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার ও ২০০১ সালে জোটগতভাবে নির্বাচন করে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৩ সালে ১ সেপ্টেম্বর দলের চতুর্থ কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তৃতীয়বার এবং ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের দশম কাউন্সিলে চতুর্থবারের মতো বিএনপি চেয়ারপারসন হন। নির্বাচনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার একটি অনন্য রেকর্ড হচ্ছে পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে ২৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতে জয়ী হওয়ার রেকর্ড কেবল তারই। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হন। সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর তিনি আইনি লড়াই করে সব কটি মামলায় জামিন নিয়ে মুক্তি পান। কারাগারে থাকাকালে তাকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু, তিনি যেতে অস্বীকার করেন। মরতে হলেও দেশেই মরবেন এমন বার্তা দেন।
পরের বছর ১১ সেপ্টেম্বর তিনি হাইকোর্টের আদেশে মুক্তি পান। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওয়ান ইলেভেন সরকারের দায়ের করা বিতর্কিত এক মামলায় ২০১৮ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি ৫ বছরের সাজা দেওয়া হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। প্রথমে রাখা হয় পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে। সেখানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে নেওয়া হয় হাসপাতালে। সেদিনই সর্বশেষ গাড়ি থেকে হেঁটে নামতে দেখা যায় তাকে। এখন পর্যন্ত এটিই ছিল হেঁটে চলার শেষ দৃশ্য। এরপর থেকে কেবলই হুইল চেয়ারে। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নির্বাহী আদেশে বেগম জিয়ার সাজা স্থগিতের পর ২৫ মার্চ গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় নামানো হয় হুইল চেয়ারেই। এরমধ্যে পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবি জানানো হলে, সরকার বারবার নাকচ করে দেয়। সঙ্গে নানা তাচ্ছিল্য আর গালমন্দ। এ অবস্থার মধ্যেই বেশ কয়েকবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। ২০২১ সালে এপ্রিলে আক্রান্ত হন করোনায়। ধীরে ধীরে আরও কিছু গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন তিনি। দেখা দেয়, আরও নানা জটিলতা। ৫ আগস্টের পর নতুন প্রেক্ষাপট। গেল ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগদানের সুবাদে বহুদিন পর প্রকাশ্য কোনো অনুষ্ঠানে দেখা গেল, ৬ বছরেরও বেশি সময় পর। এত যন্ত্রণাতেও মনোবল না হারানোর বৈশিষ্ট্য খালেদা জিয়ার অনেকটা প্রকৃতিগত। যা কেবল তাকেই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেনি, দলের নেতাকর্মীদেরও করেছে উজ্জীবিত। শত আঘাত-নির্যাতনেও কটু শব্দ উচ্চারণ না করা, জিঘাংসা না দেখানো- তাকে রাজনীতিতে দিয়েছে সম্মানিত উচ্চঅবস্থান। ওয়ান ইলেভেন থেকে শুরু হওয়া নিপীড়নের মধ্যে তার স্বজন হারানোর তালিকা বেশ দীর্ঘ। মা, বড় বোন, ছোট ভাই, সন্তানসহ নিকটাত্মীয় অনেককে হারিয়েছেন। যন্ত্রণায় কাতর হয়েছেন। সয়েছেন। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দানবীয় শক্তির অনবরত ঘা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনা ঘায়ের ওপর ঘা যোগ করেছেন তার ক্ষমতার শেষ দিন পর্যন্ত। প্রত্যুত্তরে খালেদা জিয়া দেখিয়ে গেছেন সংযম-সাবধানী বৈশিষ্ট্য। যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক, এমনকি বিএনপিবিরোধীদেরও সমব্যথী করে তুলেছে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি। তার একটু একটু করে সুস্থ হয়ে ওঠায় সেখানে যোগ হলো নতুন পালক।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
mostofa71@gmail.com