জ্বালানি বোর্ড

অভিজ্ঞদের সমাহার ঘটুক

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০১:৫৫ এএম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনসহ (বিইআরসি) সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবা ও দাপ্তরিক কাজের জন্য গ্রাহকদের ভোগান্তি নিরসন করে সেবার পথ সুগম করার জনদাবি নতুন নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালনা হলো বোর্ডের দায়িত্ব। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, অভিজ্ঞতার অভাব সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক আমলার অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে এই বোর্ডে। ‘তারা কেন বিদ্যুৎ জ্বালানি বোর্ডে’ শিরোনামে ২৪ জুন দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে এরই চিত্র উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, ‘সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগে মোট ৩৭টি কোম্পানিতে ৩০৬ জন বোর্ড সদস্য রয়েছেন। এসব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরিচালকের ১৬৭টি পদেই রয়েছেন আমলারা। আবার একই ব্যক্তি একাধিক বোর্ডেরও সদস্য! কোনো বোর্ডে বর্তমান আমলাদের পাশাপাশি প্রভাবশালী সাবেক আমলারাও জায়গা পেয়েছেন! একই আমলা একাধিক বোর্ডে যেমন রয়েছেন, আবার অন্য মন্ত্রণালয় থেকে বিদ্যুৎ-জ্বালানি কোম্পানির বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরিচালক হয়েছেন।’

‘যার কাজ যা, তা তারই সাঝে’ এই প্রবাদটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। প্রবাদটি মূলত কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব তুলে ধরে। যে ব্যক্তি যে বিষয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত, সেই কাজটি তার দ্বারাই যথাযথভাবে সম্পন্ন হতে পারে। অন্যথায়, অদক্ষ লোকের দ্বারা কোনো কাজ করতে গেলে তাতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আমাদের জ্বালানি বোর্ড এরই খণ্ডিত দৃষ্টান্ত। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ বা ‘হেমাপ্যাথি, অ্যালাপ্যাথি’ গল্পের মতো রূপকগুলোতেও আমরা যে দর্শনের প্রতিফলন দেখি এর সঙ্গেও যেন জ্বালানি বোর্ডের সামঞ্জস্য রয়েছে। না বুঝে অন্যের কাজে নাক গলালে কিংবা যুক্ত হলে শুধু হাসির পাত্র হতে হয় তা-ই নয়, ক্ষতির চিত্রও স্ফীত হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞতা নেই, তবু বিদ্যুৎ-জ্বালানি বোর্ডে বাড়তি দায়িত্বে রয়েছেন অনেক কর্মকর্তা এটি শুধু হাস্যকরই নয়, প্রশ্নবোধকও বটে। জ্বালানি বোর্ডে এই স্বেচ্ছাচারিতার পেছনে যে রয়েছে কদাচারের নানা সমীকরণ, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি এ খাতে ব্যবস্থাপনাগত বহুমাত্রিক সংকট দৃশ্যমান। ব্যবস্থাপনাগত সংকটের পেছনে অনভিজ্ঞতা অন্যতম কারণ, তাও বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেশের জ্বালানি সংকট সামাল দেওয়ার মতো গুরুদায়িত্ব যার বা যাদের কাঁধে, তাদের কেউ কেউ তিন-চারটি বিভাগে কাজ করেন কীভাবে, এর চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো এমনটি কি নীতিমালা অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য? প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ও বহুবিদ্যাবিশারদ অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘উৎকর্ষ কোনো আকস্মিক কাজ নয়, এটি একটি অভ্যাস। নিজের কাজে পারদর্শী হওয়াই উৎকর্ষের মূল।’ আমাদের খ্যাতিমান লেখক ও দার্শনিক আহমদ ছফা প্রায়ই মানুষের নিজ নিজ গুণ ও যোগ্যতার চর্চা করার বিষয়টিতে জোর দিতেন। কিন্তু জ্বালানি বোর্ডে এসব কিছুরই বালাই নেই। কোনো কোনো বোর্ড মিটিংয়ে ৫০০ ডলার পর্যন্ত সম্মানী দেওয়া হয়, এই অস্বাভাবিক বিষয়টিও উঠে এসেছে প্রতিবেদনের গর্ভে! আবার বোর্ডে সম্মানী ৬ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। মাসে কোনো বোর্ডে ৪টি পর্যন্ত মিটিং হয়। এ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ির সুবিধাসহ বৈধভাবে বোর্ড সদস্যরা অনেক সুবিধা পান। অনেকে কোম্পানি থেকে অন্যায্য সুবিধা নেন, তাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। কোম্পানির কেনাকাটা, প্রকল্প বাস্তবায়ন সব কাজেই বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে বোর্ড সদস্যদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ আয়ের সুযোগ রয়েছে। আমরা জানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের অনেক কোম্পানির প্রধান কার্যালয় ঢাকার বাইরে হলেও বোর্ড মিটিংয়ের জন্য ঢাকা আসতে হয় কর্মকর্তাদের। এক্ষেত্রে রয়েছে আবার যাতায়াত খরচের বিষয়ও। এক কথায় বলা যায়, জ্বালানি বোর্ড যেন মধুর হাঁড়ি।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, সময়ক্ষেপণ না করে বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বোর্ডে ও নীতিনির্ধারণী পদে আনা হোক পরিবর্তন। আমলানির্ভরতা নয়, চাই সংশ্লিষ্ট খাতের পেশাগত অভিজ্ঞ এবং এ খাতের ওপর নির্দিষ্ট কারিগরি জ্ঞানসম্পন্নদের নিয়ে ঢেলে সাজানো হোক, জ্বালানি বোর্ড এবং একই সঙ্গে নিশ্চিত হোক দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত