ফেরাতে হবে গতি ও আস্থা

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০১:৫৭ এএম

পুঁজিবাজার বা শেয়ারবাজার হলো এমন একটি আর্থিক বাজার, যেখানে কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ করে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানির শেয়ার বা বন্ড কিনে মালিকানার অংশীদার হন এবং মুনাফা অর্জন করেন। এটি একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং উন্নয়নের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এও অসত্য নয়। বিশে^র প্রায় সব সফল শিল্পোন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগের সবচেয়ে কার্যকর উৎস হলো পুঁজিবাজার। কারণ, শিল্পায়ন স্বভাবতই দীর্ঘমেয়াদি, ঝুঁকিনির্ভর ও  ধৈর্যসাপেক্ষ। ব্যাংক খাত, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি আমানতনির্ভর ব্যাংকিং কাঠামো, শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না, পুঁজিবাজার এর বাইরে নয়।

সম্প্রতি সরকার দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এবং সব সদস্য পরিবর্তন করে নতুন চেয়ারম্যান এবং মেম্বার নিয়োগ দিয়েছেন। এক কথায়, পুরো কমিশন পরিবর্তন করে ফেলেছে সরকার। আপাতদৃষ্টিতে সরকারের এমন পদক্ষেপ বেশ ভালো মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় ভালোর চেয়ে খারাপও হতে পারে। কেননা, এভাবে পুরো কমিশন একসঙ্গে পরিবর্তন করার ফলে কমিশনের কাজের ধারাবাহিকতা থাকে না। নতুন কমিশনের দ্রুততম সময়ের মধ্যে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নির্ভর করে, কতটা পেশাদারত্বের সঙ্গে সময় নিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর বা ট্র্যানজিশন সম্পন্ন হয়েছে। চলতি কমিশনের কাছ থেকে সঠিকভাবে কাজগুলো বুঝে নিতে পারলে প্রথম দিন থেকে পূর্ণমাত্রায় কাজ শুরু করা সম্ভব। কমিশনের কাজের সবকিছু যে লিখিত থাকবে, তা নয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে, যা চলতি কমিশনের কাছ থেকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা মুখের ভাষা থেকে বুঝে নিতে হয়।

কমিশনের বিগত চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ নিশ্চয়ই ছিল। বিশেষ করে, তাদের বিরুদ্ধে অযোগ্যতার অভিযোগ থাকা খুব স্বাভাবিক। কেননা দেশের পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে, বিগত কমিশন কোনোরকম ভূমিকা রাখতে পারেনি। কিন্তু সেই কমিশনের সবাই যে অযোগ্য, তেমনটা কথা নয়। তাদের মধ্যে অনেকে যোগ্য ছিলেন, কিন্তু হয়তো সেভাবে পারফর্ম করতে পারেননি। সেরকম সদস্যদের কিছুদিন রেখে পর্যায়ক্রমে তাদের পরিবর্তন করলে, কমিশনের কাজের ধারাবাহিকতা থাকত এবং ট্র্যানজিশন অনেক ভালো হতো। আমাদের দেশে অবশ্য দায়িত্ব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ট্র্যানজিশন বা সাকসেশন প্ল্যানের ধারণা নেই বললেই চলে। তা সে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হোক। এ কারণেই দেখা যায়, একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী তার মেয়াদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানেন না তার নিয়োগ নবায়ন হবে, নাকি চলে যেতে হবে। ফলে নতুনভাবে যিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তার বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝে উঠতে অনেক সময় লেগে যায়। কোথায় থেকে শুরু করে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সেটা নির্ধারণ করতেই অনেক সময় পার হয়, নতুনভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের। বিএসইসির নতুন কমিশনের ক্ষেত্রে সেরকম কিছু হবে না এবং তাদের ভূমিকা খুব সহসাই দেশের পুঁজিবাজারে প্রতিফলিত হবে এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বিএসইসিতে নিয়োগ পেয়েছেন মাসুদ খান। তিনি একজন পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যাট এবং দীর্ঘ সময় দেশের আর্থিক খাত নিয়ে কাজ করার বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। অন্য কমিশনারদেরও দেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আছে বলে আমাদের ধারণা। এখন শুধু ডেলিভারি করার পালা। তবে নতুন কমিশনের জন্য সময়টা মোটেই সহায়ক নয়। দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় নেই। অন্তর্র্বর্তী সরকারদের শাসনামলে দেশের অর্থনীতিতে যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে, তার নজির স্বাধীন বাংলাদেশে নেই। জিডিপি (গ্রস ডোমেসটিক প্রডাক্ট বা মোট দেশজ উৎপাদন) ছয় শতাংশের ওপর থেকে নেমে তিন শতাংশের কাছে এসেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের শোচনীয় অবস্থা। অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের চাহিদা মোতাবেক টাকা ফেরত দিতে পারছে না, যেমনটা আগে কখনো ঘটেনি। ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের অভিযোগের অন্ত ছিল না, কিন্তু ব্যাংক গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারেনি, এমন কথা আগে শোনা যায়নি।

অন্তর্র্বর্তী সরকারের নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অতি কঠোরতা অবলম্বন করায় এবং সেই সঙ্গে সন্তোষজনক বিকল্প না খুঁজে, ঢালাওভাবে কয়েকটি ব্যাংক একিভূত বা মার্জার করতে গিয়ে, দেশের ব্যাংকিং খাতে লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি করে গেছেন। দেশে ব্যাংকিং খাতের যতটুকু অবশিষ্ট ছিল, সেটুকুও শেষ হয়ে গেছে অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময়। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের ব্যবসায়ীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যেখান থেকে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে, বর্তমান সরকারও এক ধরনের দিশেহারা অবস্থায় পড়ে গেছে। এসব কারণে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে না এবং খুব সহসা যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, তেমন সম্ভাবনা দৃশ্যমান নেই। আর বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেলে, দেশের পুঁজিবাজার চাঙ্গা হবে কীভাবে, তাতে বিএসইসিতে যতই যোগ্য লোক নিয়োগ দেওয়া হোক না কেন এবং এই সংস্থাকে যতই শক্তিশালী করা হোক না কেন।

বাজারে মানসম্মত, বড় ও সুশাসিত কোম্পানির ঘাটতি, জটিল ও ব্যয়বহুল আইপিও প্রক্রিয়া, নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিকতার অভাব সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারকে উদ্যোক্তাদের জন্য অনিশ্চিত করে তোলে। আমাদের দেশের পুঁজিবাজারে কিছু সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান এবং সেসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ সেভাবে গৃহীত হয়নি। প্রথমত, দেশের পুঁজিবাজারের কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি। বাজার মূলধন বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। সেই সঙ্গে বাজারের কমপ্লেক্সিটি এবং গভীরতা, দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় পুঁজিবাজারে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। সাধারণ এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে মিউচুয়াল ফান্ড বা পোর্টফলিও-ভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সাধারণত বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কম ঝুঁকির, মধ্যম ঝুঁকির এবং অতি ঝুঁকির পোর্টফলিও বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়। অথচ এ ধরনের বিনিয়োগ সুবিধা আমাদের দেশের পুঁজিবাজারে একেবারেই অনুপস্থিত। মানসম্পন্ন পুঁজিবাজারে সাধারণত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বৃহত্তম ভূমিকা পালন করে। এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগে নিয়ে আসতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে এবং এর পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সম্পদ ব্যবস্থাপনার (ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট) মতো সেবা প্রদান করে সাধারণ গ্রাহকদের পুঁজিবাজারে নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়।

আমাদের দেশের ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই খাতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। দেশের ব্যাংকিং খাতকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সংক্রান্ত এ রকম কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উদ্বুদ্ধও করা হয়নি। তারা এখনো সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদানের মধ্যেই ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। এ রকম আধুনিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা প্রবর্তন করে দেশের পুঁজিবাজারকে একটি কার্যকর বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। আর এখন তো অনেক ব্যাংকের অবস্থাই বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। তারা সেবার বহুমুখীকরণ এবং মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা চিন্তা করবে কীভাবে? কয়েকটি ব্যাংক উল্টো এখনো দেশের স্টক মার্কেট ফটকা কারবারি বা ডে-ট্রেডার এবং কিছু সুযোগসন্ধানী বিনিয়োগকারী দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। এ রকম মার্কেট দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই বা স্ট্যাবল থাকতে পারে না এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব বিষয়ে ভালো দৃষ্টি না দিতে পারলে, পুঁজিবাজারে গতি ফেরানো সম্ভব হবে না। দেশের পুঁজিবাজারে গতি সঞ্চার করতে হলে, যে পদক্ষেপগুলো দ্রুত গ্রহণ করা প্রয়োজন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে (১) বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, (২) বাজারে আধুনিক বিনিয়োগ সেবা, যেমন পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিনিয়োগ সুবিধার প্রচলন করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া, (৩) পুঁজিবাজারে যারা বেআইনি কাজে লিপ্ত, তাদের কঠোর শাস্তির বিধান করা, (৪) বাজারে যাতে অধিক পরিমাণে আইপিও বা নতুন শেয়ার আসে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা, (৫) ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে পুঁজিবাজারে ভূমিকা রাখতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, (৬) দেশে একটি সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট প্রতিষ্ঠা করা, কেননা বন্ড মার্কেট ব্যতীত স্বল্প ঝুঁকির, মধ্যম ঝুঁকির এবং অতি ঝুঁকির পোর্টফলিও বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব নয়। এ রকম আরও কিছু পদক্ষেপ আছে, যা এখানে উল্লেখ করতে গেলে লেখার স্থান সংকুলান হবে না। 

বেশ কয়েক বছর ধরে স্তিমিত বা অকার্যকর থাকা দেশের পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে, নতুন কমিশন কতটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে বিনিয়োগকারীরা যেমন হতাশাগ্রস্ত, তেমনি এই ভেবে আশায় বুক বেঁধে আছে যে,০ ভালো কিছু পুঁজিবাজারে হবে। এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান এবং সদস্যরা দেশের পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। এর প্রতিফলন খুব সহসাই দেশের পুঁজিবাজারে পড়বে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : কানাডাপ্রবাসী সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং বিশেষজ্ঞ  ও ব্যাংক-শেয়ারবাজার বিশ্লেষক।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত