বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি ভয়াবহ শিশু নির্যাতনের ঘটনার পর আমরা একই দৃশ্য দেখি। সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, মানববন্ধন হয় এবং কখনো দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে। কয়েক দিন পর নতুন কোনো ঘটনা, সেই আলোচনাকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়, কেন একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে?
ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় পাঁচ বছরের শিশুকে কদম ফুলের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। শিশুটি শুধু ধর্ষণের শিকার হয়নি, তাকে জীবিত অবস্থায় পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে। এই ঘটনা এতটাই নৃশংস যে, ভাষা প্রায় ব্যর্থ হয়ে যায়। কিন্তু সত্য হলো, ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি এমন এক বাস্তবতার অংশ, যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা ক্রমে অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। অথচ এ রকম ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটছে।
শিশু নির্যাতনকে আমরা সাধারণত অপরাধ হিসেবে দেখি। অবশ্যই এটি অপরাধ। কিন্তু শুধু অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় না। শিশুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা আসলে একটি বহত্তর সামাজিক সংকটের লক্ষণ। এটি আমাদের পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কাঠামোর দুর্বলতার প্রতিফলন। কোনো সমাজে সবচেয়ে দুর্বল মানুষ কারা? শিশু। তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না, নিজেদের পক্ষে কথা বলতে পারে না এবং ন্যায়বিচার দাবি করতে পারে না। ফলে একটি সমাজের মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় শিশুদের প্রতি তার আচরণে। সেই পরীক্ষায় আমরা কি সত্যিই উত্তীর্ণ হতে পারছি? বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের আলোচনায় একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা এখনো রয়ে গেছে। আমরা ভাবি, বিপদ বাইরে। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনায় দেখা যায়, বিপদ ঘরের কাছেই। প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষই অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী। ফলে শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা যে সামাজিক পরিসর, সেটিই অনেক সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের প্রতি সহিংসতার সংস্কৃতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই উপস্থিত। একটি শিশুকে মারধর করে ‘মানুষ করা’, অপমান করে ‘শিক্ষা দেওয়া’, ভয় দেখিয়ে ‘শাসন করা’ এসব আচরণকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি।
গবেষণা বলছে, সহিংসতা সহিংসতাকেই জন্ম দেয়। যে শিশু ভয়ের মধ্যে বড় হয়, সে নিরাপত্তার অনুভূতি হারায়। যে শিশু অপমানের মধ্যে বড় হয়, তার আত্মমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর যে শিশু বারবার সহিংসতার মুখোমুখি হয়, তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। শিশু সুরক্ষার আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায় অনুপস্থিত থাকে। আমরা কি শিশুদের মানুষ হিসেবে দেখি, নাকি ভবিষ্যতের সম্পদ হিসেবে দেখি? আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। কথাটি শুনতে সুন্দর। কিন্তু এর একটি সমস্যা আছে। এই বাক্য শিশুদের বর্তমানকে আড়াল করে দেয়। যেন সব শিশুর মূল্য শুধু ভবিষ্যতে। অথচ একজন শিশু আজও এক পূর্ণ মানুষ। তার নিরাপত্তা, আনন্দ, মর্যাদা ও অধিকার কোনো ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নয়; এটি বর্তমানের নৈতিক দায়িত্ব। এ কারণেই শিশু সুরক্ষাকে শুধু, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে। যে দেশে শিশুরা নিরাপদ নয়, সে দেশে মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে দেশে শিশুরা ট্রমা নিয়ে বড় হয়, সে দেশে সুস্থ নাগরিক গড়ে ওঠে না। যে দেশে শিশুরা শৈশব হারায়, সে দেশের উন্নয়নও একসময় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
বিশে^র বিভিন্ন উন্নত দেশে গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে সহিংসতার শিকার মানুষের মধ্যে পরবর্তী জীবনে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, শিক্ষাগত ব্যর্থতা, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎ শিশু নির্যাতনের ক্ষতি কেবল একটি শিশুর নয়; এর অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং জাতীয় মূল্যও বিশাল। এই কথা গুরুত্ব দিয়ে, শিশু সুরক্ষাকে পুলিশি ব্যবস্থা কিংবা আদালতের বিষয় হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়ে এসেছে। এটি এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা থাকতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি জেলায় শিশু মনোসামাজিক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা ভীষণ প্রয়োজন। শিশু নির্যাতনের মামলার বিচার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং একই সঙ্গে পরিবারকেও শিশু লালন-পালনে গ্রহণ করতে হবে নতুন মানবিক দর্শন। সবচেয়ে বড় কথা, শিশুদের বিষয়ে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শিশু কোনো সম্পত্তি নয়, কোনো বোঝা নয়, কোনো বিনিয়োগও নয়। শিশু একজন মানুষ এবং একজন মানুষের মতোই তার মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। ধোবাউড়ার সেই পাঁচ বছরের শিশুটি আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে না জাগায়, তাহলে হারিয়ে যাবে আরও অনেক শৈশব, আরও অনেক স্বপ্ন।
রাষ্ট্রের শক্তি সেনাবাহিনীর অস্ত্রে নয়, অর্থনীতির আকারেও নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ, তা দিয়ে। আর শিশুদের চেয়ে দুর্বল নাগরিক সমাজে আর কেউ নেই। তাই আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে শিশুরা শুধু বেঁচে থাকবে, নাকি এমন একটি দেশ, যেখানে তারা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং নির্ভয়ে বড় হতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে। সবচেয়ে বড় কথা, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে।
লেখক : চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ