রঙ ও ছবির রবীন্দ্রনাথ

বাংলা সাহিত্যের মহানায়ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা সাধারণত মনে রাখি কবি, গীতিকার, নাট্যকার, গল্পকার বা দার্শনিক রূপে। কিন্তু তিনি ছিলেন এক অসাধারণ চিত্রকরও। এ নিয়ে লিখেছেন  অনিন্দ্য নাহার হাবীব

আজ ৭ তারিখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। শুধু কবিতা, গান, গল্প কিংবা উপন্যাস নয়, শিল্পের আরও নানা ভুবনে অবাধ বিচরণ ছিল তার। বহুমুখী প্রতিভার এই জ্যোতির্ময় নক্ষত্রের এক স্বতন্ত্র পরিচয় হলো তার চিত্রশিল্পী সত্তা। তুলির আঁচড়ে, রঙের বিন্যাসে তিনি কাগজের বুকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন এক নতুন জগৎ, যেখানে রেখা ও বর্ণের এক অসামান্য মেলবন্ধন দেখা যায়। সাহিত্যের আঙিনা থেকে চিত্রকলায় তার এই যাত্রা ছিল এক অপ্রত্যাশিত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মে আমরা খুঁজে পাই তার ভেতরের এক সংবেদনশীল মন, যা পরিচিত জগতের বাইরেও এক রহস্যময় সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করতে চেয়েছিল। তার এই চিত্রশিল্প কেবল তার সৃজনশীলতার আরও একটি দিক উন্মোচন করে না, বরং তার সামগ্রিক দার্শনিক ও মানবিক ভাবনারও এক নীরব ভাষ্য হয়ে ওঠে। আসুন, সেই বর্ণময় জগতে প্রবেশ করা যাক, যেখানে শব্দ থেমে যায় এবং রঙ কথা বলে ওঠে।

‘ঐগুলি কেবল রেখাই নয়, ঐগুলি তার থেকেও কিছু বেশি। আমার চিত্রাঙ্কিত স্বপ্ন এক কাব্যিক কল্পনার দর্শন।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শিল্পচর্চা যদিও পরিণত বয়সে শুরু বাংলা ও বিশ্বের চিত্রকলার ইতিহাসে এক অভিনব অধ্যায়। কবিতা কাটাকুটির সময় হঠাৎ করেই রঙ ও রেখার প্রতি তার আকর্ষণ জন্ম নেয়। ১৯২৪ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত (১৯৪১) প্রায় আড়াই হাজারের বেশি চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেন তিনি। তবে মূলত ১৯২৮ সাল থেকে তার পূর্ণমাত্রিক চিত্রচর্চা শুরু হয়।

ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্য

রবীন্দ্রনাথ বেড়ে উঠেছিলেন যে পরিবারে, সেখানে শিল্প ছিল দৈনন্দিনের অংশ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী এদের চিত্রচর্চা ছিল উল্লেখযোগ্য। গুণেন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার পথিকৃৎ। এই শিল্প-আবহই কবিকে পরিণত করেছিল এক আত্মবিস্তৃত শিল্পস্রষ্টায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলা তার সৃজনশীল মানসের এক অনন্য বিস্তার, যা কবিতার ভাষা ছাপিয়ে পৌঁছে যায় রেখা, রঙ ও ছন্দের এক অন্তর্জগতে। তাঁর চিত্রকলার মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে একাধারে বিষন্নতা, ব্যঙ্গ, রহস্যময়তা ও সৌন্দর্যচেতনার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। কবিগুরু তার ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়েরি’-তে লিখেছিলেন, ‘...আর্টিস্ট আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর্টের সাধনা কী? আর্টের একটা বাইরের দিক আছে সেটা হচ্ছে আঙ্গিক, টেকনিক, তার কথা বলতে পারি নে। কিন্তু ভেতরের কথা জানি। সেখানে জায়গা পেতে চাও যদি তাহলে সমস্ত সত্তা দিয়ে দিয়ে দেখো, দেখো, দেখো।... দেখতে পাওয়া মানে প্রকাশকে পাওয়া। বিশ্বের প্রকাশকে মন দিয়ে গ্রহণ করাই হচ্ছে আর্টিস্টের সাধনা।’

যামিনী রায়কে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, তার কাছে ‘ছবি’ মানে হলো একটা সত্যি ঘটনার সাক্ষী। ছবি যত স্পষ্ট হবে, যত ‘আমার’ হবে, ততই সে ভালো। ভালো-মন্দের আর কোনো মাপকাঠি নেই। আবার বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন, তখন ছবি আঁকা নিয়ে তার আধুনিক ভাবনাও শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ছবিটা ছবিই, তার বেশি কিছু নয়, তার কমও নয়। ভারতীয়, অজন্তীয়, ওসব কিছু না।’ অনেকে হয়তো ভাবেন, বুড়ো বয়সে রবীন্দ্রনাথের খেয়াল চাপল ছবি আঁকার। পা-ুলিপির কাটাকুটি ঢাকতে আনমনে আঁকিবুঁকি, রেখায় রেখায় নতুন নকশা এগুলোই নাকি তার ছবি আঁকার শুরু। শিল্পের আঙিনায় তার আসা, আর ছবি আঁকার বিচারমূলক দিকগুলোর প্রতি আগ্রহ এসব নাকি জীবনের শেষ ১৭ বছরেই দেখা যায়। তবে সত্যি বলতে, রবীন্দ্রনাথের মনে ছবি আঁকার পোকাটা কখন নড়ে উঠেছিল, তা বলা কঠিন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পরিবেশটাই তো ছিল শিল্প আর সাহিত্যের আঁতুড়ঘর। তাই জোর দিয়ে বলা যায়, ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, হয়তো আপন মনে কিছু আঁচড়ও কাটতেন। ক্ষিতীশ রায় তো বলেছেন তিনি রবীন্দ্রনাথের কিছু ড্রইং দেখেছেন। বুলবন ওসমানও মনে করেন, ১৮৭৪ থেকে ১৮৮২ সালের মধ্যে ‘মালতি’ নামের এক পুঁথির পাতায় তিনি ছবি আঁকতেন। তবে সেগুলো হয়তো বাঁধাধরা শিল্পীর মতো ছিল না, নিজের খেয়ালে আঁকা।

রবীন্দ্রনাথ নিজেই তার ‘আমার ছবি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘(১৬ বছর বয়সে)... তত দিনে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ প্রাচ্য ঐতিহ্য মেনে আধুনিক শিল্প আন্দোলন শুরু করে দিয়েছেন। আমি ঈর্ষান্বিত হয়ে তার ক্রিয়াকর্ম পর্যবেক্ষণ করছি। তত দিনে আমার সম্পূর্ণ বোঝা হয়ে গিয়েছে যে শব্দের আঁটোসাঁটো চৌহদ্দির বাইরে যাওয়ার ছাড়পত্র ভাগ্য আমাকে মঞ্জুর করেনি।’

রবীন্দ্রনাথের ছবিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় প্রাকৃতিক দৃশ্য, মানুষের প্রতিকৃতি আর পাখি ও জীবজন্তুর ছবি। যদিও এই ভাগটা তার বিশাল কাজের পুরোটা বোঝাতে পারে না, তবুও আলোচনার সুবিধার জন্য এটা করা হয়। তবে এছাড়াও আরও কিছু ভাবে তাদের ব্যাখ্যা করা যায়।

মুখাবয়ব

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায় নর-নারীর মুখচ্ছবি কেবল বাহ্যিক অবয়ব নয়; বরং তা হয়ে ওঠে মানসিক অভিব্যক্তির মূর্ত প্রতিচ্ছবি। মুখাবয়বের রেখায় তিনি তুলে ধরেন চরিত্রের অভ্যন্তরীণ প্রবণতা কখনো তা বিষন্ন, কখনো আভিজাত্যপূর্ণ, আবার কখনো গূঢ় অর্থবাহী। বিশেষ করে নারীমুখাবয়বগুলোতে ধরা পড়ে কবির গভীর সংবেদনশীলতা ও লালিত্যবোধ। উজ্জ্বল লাল, ধূসর, কালো কিংবা বাদামি রঙে আঁকা এই মুখগুলো যেন তার অন্তর্জগতের নিঃশব্দ আর্তি যেখানে ভাষা নয়, দৃষ্টিই প্রধান বাহক।

চেতনার নাট্যমঞ্চ

রবীন্দ্রনাথের অনেক চিত্রকর্মে দেখা যায়, মানুষের অবয়ব প্রকৃতির মধ্যে মিশে আছে, যেন এক রূপক বা অ্যালেগরি। প্রকৃতি এখানে কেবল পটভূমি নয়, বরং একটি সক্রিয় চরিত্র যার মাধ্যমে মানুষ ও প্রকৃতির আন্তঃসম্পর্ককে ধরা হয়েছে বিমূর্ত রূপে। গাঢ় আঁধার, বৃক্ষরাজি, মেঘলা আকাশ সব মিলিয়ে এই ছবিগুলো একধরনের ‘কবিতার মতো’ দৃশ্যপট তৈরি করে। যেন রঙ ও রেখায় গাঁথা একটি চিত্রনাট্য।

রূপ ও রসের মূর্ত রূপান্তর : রবীন্দ্রনাথের চিত্রশৈলীতে বিমূর্ততা এক অনিবার্য ভাষা। এই আলংকারিক চিত্রগুলোতে তিনি আর কিছুর অনুকরণ করেন না বরং আত্মগত একটি ছন্দ, চলন, রঙ-গঠন দিয়ে এক অভ্যন্তরীণ ভাষা নির্মাণ করেন। এখানেই রবীন্দ্রনাথের মৌলিকত্ব সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল। এখানে নেই প্রচলিত নিসর্গ, নেই চেনা অবয়ব আছে অভিজ্ঞতার রঙিন প্রতিচ্ছবি। কালি, জলরঙ, কিংবা পোস্টার রঙ ব্যবহার করে তিনি এমন সব গঠন তৈরি করেন যা যেন এক অবচেতন মনের নির্ভরযোগ্য মানচিত্র।

সৌন্দর্যচেতনার আত্মপ্রকাশ

রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে দেখেছেন অন্তর চোখে। তার আঁকা প্রাকৃতিক দৃশ্যপটে পাওয়া যায় স্নিগ্ধতা, বিষাদ, নীরবতার আশ্চর্য এক মিশ্রণ। ‘নিসর্গ’ শীর্ষক ছবিটির কথা বলা যায় যেখানে গাছপালা, কুটির, বনবনানীর ফাঁকে আকাশের আভাস যেন প্রকৃতির মধ্যেও নিঃসঙ্গতা ও আশ্রয়ের সন্ধান জাগায়। তার রঙ প্রয়োগে কখনো দেখা যায় রোমান্টিকতার অভিব্যক্তি, আবার কখনো বিষন্নতার প্রতিচ্ছবি।

প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্য যেন এক অন্তর্লোকীয় অনুভবের প্রতিফলন।

স্বতঃস্ফূর্ততা ও ছন্দের জয়গান : রবীন্দ্রনাথের ছবিতে ব্যবহৃত মাধ্যম যেমন কালি, জলরঙ, পোস্টার কালার ইত্যাদি সবই তার স্বতঃস্ফূর্ততার বাহক। তার আঁকায় কোনো অনুশীলনভিত্তিক ঘষামাজা নেই; আছে এক অনিবার্য বিস্ফোরণ। রেখার টান, রঙের বিন্যাস, গাঢ়তা ও আলোর ব্যবহারে তিনি এমন এক গতিময়তা সৃষ্টি করেন যা জৈবিক এবং সজীব। তার শিল্পভাবনা যেন জন্মায় ভেতর থেকে, বুদ্ধির নয় অনুভবের খেলা।

রঙের ভাষায় রবির অন্তর্জগৎ

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা কোনো নির্দিষ্ট রীতির অনুসারী নয়, বরং এক নতুন ভাষা যা আত্মার গভীর থেকে উৎসারিত। এই ভাষায় মিলেমিশে থাকে দুঃখ, সৌন্দর্য, ব্যঙ্গ, রহস্য, আত্মদর্শন ও রসাস্বাদনের এক বিরল সংমিশ্রণ। রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার এক উল্লেখযোগ্য দিক হলো রেখাচিত্র। তার অনেক ছবিই শুধু কালি আর কলম দিয়ে আঁকা। রেখার টানে তিনি কত না রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন! একটা সাদা কাগজের ওপর রেখাগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে নতুন নতুন ছবি তৈরি করে, তা তিনি গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখতেন। তার ছবি আঁকার আলোচনায় রঙের ব্যবহারও খুব জরুরি। একটু ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, তার কাজে সবুজ আর নীল রঙের ব্যবহার তেমন নেই, বরং গাঢ় খয়েরি বা কালচে খয়েরি রঙের প্রাধান্য দেখা যায়। অনেকে এর কারণ হিসেবে তার দৃষ্টির বিশেষত্বকে দায়ী করেছেন। ব্রিটিশ জার্নাল অব ঈস্থেটিক্স-এর ১৯৮৭ সালের একটা সংখ্যায় লেখা হয়েছিল যে রবীন্দ্রনাথ প্রোটোন্যাপ ছিলেন। এর ফলে তিনি নীল আর বেগুনি রঙ দেখার সময় লাল রঙের সঙ্গে এবং গাঢ় খয়েরি বা কালো রঙের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন।

শিল্পী রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে এক গভীর নিঃসঙ্গতাকে তুলে ধরেছেন, সেই সঙ্গে পুরনো ধ্যানধারণার প্রতি এক হালকা বিদ্রুপও তার ছবিতে দেখা যায়। তার প্রতিকৃতির দিকে তাকালে হঠাৎ নিজেকে একা মনে হতে পারে, নিজের জীবনটাও কেমন যেন ছোট আর অর্থহীন লাগে। অন্যান্য বিষয়ে অকপটে নিজের ভাবনা প্রকাশ করলেও, প্রথম দিকে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা দ্বিধা বোধ করতেন। হয়তো ছবি আঁকার প্রথাগত জ্ঞানের অভাবই এর কারণ ছিল। তিনি এ কথাও বলেছেন যে নন্দলাল আর অবনীন্দ্রনাথের মতো ছবি আঁকা শেখেননি বলেই তার এই দ্বিধা। তবে তার আঁকা ছবি প্রথম দিকে ভারতে তেমন সমাদৃত না হলেও, ইউরোপে কিন্তু বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল। সেখানে অনেক দেশে তার ছবি দেখানো হয় এবং প্রশংসাও জোটে। অবশ্য কোথাও কোথাও সমালোচনাও হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে রঙের উজ্জ্বলতা নেই আছে অন্তর্লীন বিষন্নতা। গাঢ় বাদামি, কালো, লাল বা হলুদাভ রঙে তিনি নির্মাণ করেছেন এক অন্তর্মুখী, স্বপ্নিল দৃশ্যপট। তার ছবিতে কখনো রমণী মগ্ন, কখনো প্রকৃতি বিষণœ, কখনো শিশু কোলের আশ্রয়ে। ‘মা ও শিশু’ কিংবা ‘নিসর্গ’ শিরোনামে তার কিছু চিত্র যেন গীতবিতানের অন্য রূপান্তর গান যেখানে রঙ হয়ে ওঠে। ১৯৩০ সালে আর্জেন্টিনার বুদ্ধিজীবী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সহযোগিতায় প্যারিসের পিগ্যাল আর্ট গ্যালারিতে প্রথম প্রদর্শিত হয় রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম। এরপর বার্লিন, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, মস্কোসহ বিভিন্ন শহরে প্রদর্শনী হয়। ইউরোপীয় শিল্পবোদ্ধারা এই ছবিগুলোতে খুঁজে পেয়েছিলেন আধুনিক ইউরোপীয় স্টাইলের মৌলিক ছাপ, অথচ সেগুলো ছিল সম্পূর্ণ ‘রাবীন্দ্রিক’।