মানুষের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন বাহ্যিক সব উপায়-উপকরণ অকেজো হয়ে যায়। তখন মানুষ অসহায় হয়ে সমাধানের পথ খুঁজে। এমন সংকটময় মুহূর্তে যদি কোনো আলোকবর্তিকা সামনে আসে, তবে মানুষ যেমন আশার আলো দেখতে পায়, তেমনি নিজের ভেতরের সৎ দিকগুলোও জেগে ওঠে। আল্লাহর পথে চলা, সত্যবাদিতা, তাকওয়া ও নিঃস্বার্থ সদাচরণ কখনো বিফলে যায় না। এমনকি কোনো মানুষ যদি নিঃসঙ্গ এক গুহাতেও আটকে থাকেন, মহান আল্লাহ তার কোনো নেক আমল ও খাঁটি নিয়তের বরকতে মুক্তি দান করেন।
হাদিসগ্রন্থ বুখারি শরিফে বর্ণিত একটি অনুপম কাহিনি রয়েছে, যেখানে তিন ব্যক্তি এক ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়েন। তারা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন এবং হঠাৎ একটি পাথর গড়িয়ে এসে গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। মৃত্যুর আশঙ্কা, নিঃসঙ্গতা ও নিরুপায় অবস্থার মধ্যে তারা বুঝে নেন, এ অবস্থা থেকে তাদের উদ্ধার করতে পারেন কেবল আল্লাহ। আর সেই মহান রব আল্লাহকে ডাকতে হবে এমন কিছু আমলের অসিলায়, যা তারা একান্তভাবে শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশেই করেছিলেন।
এই কাহিনিতে তিনজন মানুষের তিনটি আলাদা চরিত্র, তিনটি সত্যবাদিতা ও তাকওয়ার গল্প এবং অভাবনীয় প্রতিদান উঠে আসে। তাদের দোয়া, নিঃস্বার্থ আমল এবং সেই আমলের প্রতি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টি আমাদের জন্য একদিকে যেমন শিক্ষণীয়, তেমনি তা হৃদয়গ্রাহী। এতে প্রমাণিত হয় খাঁটি নিয়ত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, পিতা-মাতার খেদমত এবং আমানতের হক আদায় করা, এসব গুণ মহান আল্লাহর কাছে কতটা মূল্যবান।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে এসেছে, একবার তিনজন ব্যক্তি ভ্রমণে বের হয়। পথিমধ্যে এক ভয়ানক ঝড় ও বৃষ্টির কবলে পড়ে তারা আশ্রয় নেয় পাহাড়ের একটি গুহায়। কিছুক্ষণ পর একটি বিশাল পাথর গড়িয়ে এসে গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। গুহার অন্ধকারে তারা অনুভব করেন, দুনিয়ার কোনো বাহ্যিক উপায় তাদের আর বাঁচাতে পারবে না। তখন একজন বললেন, আল্লাহর কসম! আমাদের উদ্ধার করার ক্ষমতা এখন কেবল আল্লাহরই। তাই আসুন, আমরা জীবনে যেসব নেক কাজ একমাত্র আল্লাহর জন্যই করেছি, সেসবের অসিলায় তার কাছে দোয়া করি।
প্রথমজন দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমার এক শ্রমিক ছিল, যে নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে কাজ করেছিল। কিন্তু সে মজুরি না নিয়েই চলে যায়। আমি তা কৃষিকাজে লাগাই এবং তা থেকে ধীরে ধীরে লাভ তুলে একটি গাভী কিনে রাখি। অনেক বছর পর সে ফিরে এসে নিজের মজুরি চায়। আমি তাকে বলি, ওই গাভীটাই তার হক, কারণ ওই নির্দিষ্ট মজুরি থেকেই পর্যায়ক্রমে তা হয়েছে। সে তা নিয়ে চলে যায়। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, আমি কেবল আপনার ভয়েই এমনটি করেছিলাম। এর সঙ্গে সঙ্গে পাথর কিছুটা সরে যায়।
দ্বিতীয়জন দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমার মা-বাবা ছিলেন খুব বৃদ্ধ। আমি প্রতি রাতে দুধ নিয়ে তাদের খাওয়াতে যেতাম। এক রাতে দেরি হওয়ায় তারা ঘুমিয়ে পড়েন। আমি সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকি তাদের জাগার অপেক্ষায়। আমার সন্তানরা তখন ক্ষুধায় কাঁদছিল, কিন্তু আমি মা-বাবা আগে না খাওয়া পর্যন্ত তাদের কিছুই দিইনি। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, আমি এ কাজ শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই করেছি। এবার পাথর আরও কিছুটা সরে যায় এবং আকাশ দেখা যায়। তৃতীয় ব্যক্তি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল, তাকে আমি ভালোবাসতাম। একদিন সে অভাবের তাড়নায় একশ দিনার চায়। আমি সেই অর্থ সংগ্রহ করে তার সম্মতিতে কাছে যাই। কিন্তু যখন গুনাহের নিকটবর্তী হই, তখন সে বলে, আল্লাহকে ভয় করো! আমি সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে আসি এবং কোনো অর্থও ফেরত চাইনি। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, আমি আপনার ভয়েই নিজেকে বিরত রেখেছি। তখন পাথর সম্পূর্ণ সরে যায় এবং তারা তিনজন নিরাপদে গুহা থেকে বেরিয়ে আসেন।
এই অনুপ্রেরণাদায়ী কাহিনিটি আমাদের শিখিয়ে দেয়, মানবজীবনের কঠিনতম মুহূর্তে মহান আল্লাহর কাছে কোনো নেক কাজের অসিলা করে প্রার্থনা করলে তিনি কবুল করেন এবং বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন। আলোচ্য ঘটনায় তিনজন মানুষ তিনটি মূল্যবান গুণ প্রদর্শন করেছেন। এক. আমানতের হক আদায় করা। দুই. মা-বাবার প্রতি নিষ্ঠা ও ভক্তি। তিন. আত্মসংযম ও তাকওয়া।
এগুলো নিছক কোনো ঘটনা নয়, বরং আমাদের জীবনের জন্য এক একটি আলোকবর্তিকা। এই হাদিস আমাদের সামনে এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তা হলো, নেক আমলের প্রতিদান কেবল আখেরাতেই নয়, বরং দুনিয়ার জগতেও পাওয়া যায়। একদিকে তাদের কর্ম, অপরদিকে নিয়ত, উভয়ই ছিল পবিত্র। আর তাই তাদের দোয়া ছিল কবুলযোগ্য।
আজকের সমাজে আমরা যখন দেখি অন্যায়, প্রতারণা ও আত্মকেন্দ্রিকতা বেড়ে যাচ্ছে, তখন এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভালো পথে চলাই দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য কল্যাণকর। আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে হয়, তবে তা যেন এক একটি জমাকৃত সম্পদ, যা প্রয়োজনের সময় মুক্তির বাহন হয়ে দাঁড়ায়।
গুহার সেই তিনজনের মতোই হয়তো আমরাও কোনো না কোনো সময়ে আটকে যাব। তখন আমাদের একমাত্র ভরসা হবে সেই আমলগুলো, যা আমরা একমাত্র আল্লাহর জন্য করেছিলাম। এই কাহিনি যেন আমাদের জীবনকে করে তুলে আরও বেশি নীতিবান ও আখেরাতমুখী।