সীমান্তে আরও ১০ জনকে আটক বিজিবির

ভারতের আসাম ও গুজরাট রাজ্য থেকে চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ‘পুশ-ইন’ শুরু হয়েছে। সর্বশেষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের বকচর সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে গতকাল শনিবার বিকেলে ভারত থেকে অবৈধপথে আসার সময় ১০ জনকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এর আগে গত শুক্রবার সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন সুন্দরবনের নদীপথ দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ৬২ জনকে অনুপ্রবেশ করিয়েছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজারের ধলই সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় নারী-শিশুসহ ১৫ জনকে বিজিবি আটক করেছে বলে জানা গেছে।

বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক অস্বস্তি বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা চলতি মাসের ৪ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে অন্তত ১৬৭ জনকে ‘পুশ-ইন’ করেছে। এর মধ্যে এক দিনেই খাগড়াছড়ি ও কুড়িগ্রামে ১১০ জনকে প্রবেশ করানো হয়, যাদের অনেকেই রোহিঙ্গা বা ভারতের গুজরাটের বাসিন্দা বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে আনুষ্ঠানিক বার্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে বার্তাটি পৌঁছানো হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যদি কেউ প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিক প্রমাণিত হয়, শুধু তখনই তাকে গ্রহণ করা হবে।

বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আটক ব্যক্তিরা বাংলা ভাষায় কথা বললেও যাচাই-বাছাই না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। এ অবস্থায় সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে ভারতীয় বিমান সংস্থার অনির্ধারিত একটি ফ্লাইটে প্রায় ২০০ জনকে গুজরাট থেকে ত্রিপুরায় আনা হয়েছে, যাদের একটি অংশ বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সূত্রমতে, বাকিদেরও কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশে পাঠানো হতে পারে।

সুন্দরবন দিয়ে ৬২ জনকে পুশ-ইন : সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন সুন্দরবনের নদীপথ দিয়ে বিএসএফের ৬২ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের খবর পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার সাতক্ষীরা রেঞ্জের সীমান্তবর্তী সুন্দরবনের মান্দারবাড়ীয়া এলাকার নদীপথ দিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। তবে তারা বাংলাদেশি না ভারতীয় তা সঠিকভাবে জানা যায়নি।

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জ সহকারী এবিএম হাবিবুল ইসলাম বলেন, পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের মান্দারবাড়ীয়া এলাকায় অনুপ্রবেশ করা ৬০-৬২ জনকে আটক করে মান্দারবাড়ীয়া টহল ফাঁড়িতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, বিএসএফ সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। আরও কিছু সংখ্যক লোককে বিএসএফ বনের ভেতর রেখে গেছে।

হাবিবুল ইসলাম আরও বলেন, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডকে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে জানানো হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ তারা নেবে। তবে এ ব্যাপারে বিজিবির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে কোস্ট গার্ড কৈখালি স্টেশন সূত্রে জানায়, সুন্দরবন থেকে ৬২ জনকে আটকের বিষয়টি তারা বন বিভাগের মাধ্যমে খবর পেয়েছে।

কমলগঞ্জে অনুপ্রবেশকালে আটক ১৫ : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ধলই সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শিব নারায়ণ শীল বলেন, গত বুধবার সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকালে ১৫ জনকে বিজিবি আটক করেছে। তাদের মধ্যে ৯ জন পুরুষ, তিন নারী ও তিন শিশু রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জানায়, দীর্ঘ পাঁচ বছর থেকে তারা ভারতের আসামে বসবাস করে আসছিল। হঠাৎ করে ভারতীয় পুলিশ তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে হেলিকপ্টারে করে ত্রিপুরার মানিক ভা-ারে নিয়ে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। তারা প্রায় তিন শতাধিক লোক ছিল। বিএসএফ তাদের কয়েকজনকে ধলই সীমান্ত দিয়ে গেট খুলে ‘পুশ-ইন’ করলে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তবে অন্যদের কোন সীমান্তে নিয়ে গেছে তা তারা বলতে পারেনি।’

এদিকে ১৫ জনকে বিজিবি আটকের পর তথ্য গোপন রাখে। বুধবার সকালে আটককৃতদের কমলগঞ্জ থানায় নিয়ে আসার পর ফের তাদের নিয়ে ধলই সীমান্তে চলে যায় বিজিবি। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে রাতে আটককৃতদের ধলই সীমান্ত এলাকার সিপাহী হামিদুর রহমান জাদুঘরে আটকে রাখে বিজিবি।

বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জাকারিয়া বলেন, ‘আটককৃতরা সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলছেন। যাচাই-বাছাই করে তাদের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনার পর মৌলভীবাজার জেলার সব সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।’

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্ত দিয়ে গত ৭ মে রাতের দিকে নারী ও শিশুসহ ১৫ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করলে বিজিবি তাদের আটক করে। কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শিব নারায়ণ শীল গণমাধ্যমকে জানান, আটককৃতদের মধ্যে ৯ জন পুরুষ, তিনজন নারী ও তিনজন শিশু রয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, তারা পাঁচ বছর ধরে ভারতের আসামে বসবাস করছিল। হঠাৎ ভারতের পুলিশ তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে হেলিকপ্টারে করে ত্রিপুরায় নিয়ে যায় এবং পরে বিএসএফের মাধ্যমে সীমান্তে এনে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে আটক ১০ : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের বকচর সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভারত থেকে অবৈধপথে আসার সময় ১০ জনকে আটক করেছে বিজিবি। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বকচর বিওপির সদস্যরা তাদের আটক করেন।

বিজিবির ৫৩ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মো. মনির-উজ-জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাদের সদর থানায় সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বিজিবি ও পুলিশ জানায়, ৫৩ বিজিবির অধীন বকচর বিওপির নায়েক সুজিত কুমারের নেতৃত্বে একটি টহলদল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের বকচর গ্রামে টহল দিচ্ছিল। এ সময় সীমান্ত পিলার ৩৪/৩-এসের কাছ দিয়ে ১০ জন ব্যক্তিকে ভারত থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেখে টহলদল তাদের চ্যালেঞ্জ করলে তারা পালানোর চেষ্টা করে। পরে টহলদল ধাওয়া করে তাদের আটক করে। আটককৃত ব্যক্তিরা তিন মাস আগে অবৈধভাবে ভারতের চেন্নাই শহরে প্রবেশ করেছিল বলে বিজিবি জানায়।

এদিকে সদর থানার ওসি মো. মতিউর রহমান বলেন, বিজিবির হাতে আটকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাদের গতকাল আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের আচরণ ১৯৭৫ সালের যৌথ সীমান্ত নির্দেশিকা ও ২০১১ সালের সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অতীতে ২০০৩ সালে লালমনিরহাট সীমান্তে এমন একটি ঘটনা ঘটলেও তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক চাপের ফলে ভারত পিছু হটে। এবারও তেমন কৌশল অবলম্বন করতে পারে বাংলাদেশ।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা)