ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের আলপনা প্লাজার কম্পিউটার দোকানদার হিসেবে পরিচিত ফারুক চৌধুরী। এরপর শতকোটি টাকার মালিক। কীভাবে? ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের আমলে যেমনটা সচরাচর হয়েছে। আঙুল ফুলে টাকার গাছ বনে যাওয়া। ফারুক চৌধুরী তাদেরই একজন। কায়দা করে প্রথমে হন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এরপর ভোটহীন দাপটে হয়ে যান উপজেলা চেয়ারম্যান।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ১৮টি প্রকল্পের প্রায় ৩৫ লাখ টাকা মেরে দেন ফারুক। এর আগেও তার বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে কমিশনের বিনিময়ে মাদক কারবারিদের আশ্রয় প্রদান ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে সাড়ে ১০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এখন ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
জানা যায়, ফারুক চৌধুরীকে এলাকার লোকজন ‘কম্পিউটার ফারুক’ নামে চেনেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, ফারুককে একযুগ আগেও কর্ণফুলীতে কেউ দেখেননি। তিনি আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্তও ছিলেন না। কিন্তু চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার এক শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাকে ম্যানেজ করে ২০১৩ সালে বাগিয়ে নেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদকের পদ। ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের যে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেটি ভেঙে ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর ফারুক চৌধুরীকে সভাপতি করে ৭১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ। এরপর তাকে কর্ণফুলী উপজেলা কমিউনিটিং পুলিশের সভাপতি করা হয়। ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নৌকা প্রতীকে নবসৃষ্ট কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বনে যান তিনি। এরপর দ্বিতীয় দফায় ২০২২ সালের ২ নভেম্বর ফের উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
অভিযোগ রয়েছে, ফারুক চৌধুরী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ পেয়ে হয়ে ওঠেন কর্ণফুলী উপজেলার অঘোষিত বড় নেতা। উপজেলার সব কাজেই তার সিদ্ধান্ত ও মতামত প্রাধান্য পেত। তার ভয়ে তটস্থ থাকে স্বয়ং উপজেলার সব কর্মকর্তা-কর্মচারী। তিনি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ডানহাত দাবি করে ভয় দেখাতেন। ফলে পুরো উপজেলার নেতাকর্মীরা তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন। এ নিয়ে ওই সময় স্থানীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনে চাপা ক্ষোভ ছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফারুকের কারণে কর্ণফুলীর বিএনপি-জামায়াতের শত শত নেতাকর্মী ছিলেন বাড়িছাড়া। কর্ণফুলীতে তার একক ইশরায় গত সাত বছরে নানা প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার লুটপাট ও আত্মসাৎ হয়েছে। তার ইচ্ছায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও আটজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে পরিবর্তন করেছে জেলা প্রশাসক।
গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপরই কর্ণফুলী বড় উঠানের একাধিক বিএনপি নেতা জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরেন আসেন। এ খবর পাওয়ার পরই তিনি আত্মগোপনে চলে যান। স্থানীয়ারা মনে করছেন, ফারুক চৌধুরী কানাডায় পালিয়ে গেছেন। কানাডায় তার বাড়ি-গাড়ি রয়েছে।
ফারুক চৌধুরীর অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। তাতে বলা হয়, তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। কমিশন অভিযোগটি আমলে নিয়ে গত বছর ২৬ নভেম্বর অনুসন্ধান শুরু করে।
সংস্থাটির উপসহকারী পরিচালক মো. নিজাম উদ্দিন এ অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। তিনি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ফারুক চৌধুরী উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তার রেকর্ডপত্রসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের রেকর্ডপত্র চেয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেন। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগসংশ্লিষ্ট রেকপর্ডপত্র দুদকে জমা হচ্ছে।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সময় শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত ইয়াবা কারবারি মোহাম্মদ জাফরের ফ্ল্যাট ক্রয়ের প্রধান সাক্ষী তিনি। ২০১৫ সালের ১৩ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে উদ্ধার হওয়া পাঁচ লাখ পিস ইয়াবা মামলার চার্জশিটভুক্ত প্রধান পলাতক আসামি ছিলেন মোহাম্মদ জাফর। একই সালের ২৫ জুলাই পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত সড়কে জাফর র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন। তখন ঘটনাস্থল থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবা ও দুটি বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। জাফর চট্টগ্রাম আগ্রাবাদের শান্তিবাগ আবাসিক এলাকায় হিলটন প্রপার্টিজের ফেরারি টাওয়ারের ডি-১ ও সি-১ দুটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেন। চুক্তিপত্র অনুযায়ী দুটি ফ্ল্যাটের ক্রয়মূল্য দেখানো হয় মাত্র ৬০ লাখ টাকা। ফ্ল্যাট ক্রয়ের চুক্তিপত্রে প্রধান সাক্ষীর হিসেবে ফারুক চৌধুরীর নাম। নিহতের আগপর্যন্ত মোহাম্মদ জাফর চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা, গহিরা ও পতেঙ্গা এলাকায় ইয়াবা কারবার করতেন। তার মাদক কারবারের পেছনে ফারুক চৌধুরীর হাত ছিল।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ফারুক চৌধুরী উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার পর তার সম্পদের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে। ওই সময়ে তিনি অনেক জমিজমা কিনেছেন। তার ঢাকার নিউ এলিফ্যান্ট রোডের আলপনা প্লাজায় অ্যালগেয়ী কম্পিউটার দোকান রয়েছে। আয়ের উৎস হিসেবে কৃষি খাত থেকে বার্ষিক ৩০ হাজার টাকা আয় হয় তার। আর ব্যবসা থেকে আয় ৬ লাখ ৮০ হাজার ২০০ টাকা। অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে তার নগদ ৩ লাখ টাকা, ব্যাংকে ৮ লাখ টাকা জমা রয়েছে। এ ছাড়া ১২ লাখ টাকা মূল্যের একটি প্রাইভেট কার, নিজ নামে ১০ ভরি স্বর্ণ, স্ত্রী মেহেরুন্নেছার নামে ৫ ভরি স্বর্ণ, একটি টিভি, একটি ফ্রিজ, একটি এসিসহ আসবাবপত্র রয়েছে। আর স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৫০ শতক কৃষিজমি, ১০ শতাংশ অকৃষিজমি, একটি বাড়ি ও একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে।
২০১৬ সালের ৩০ জুন ফারুক চৌধুরীর ব্যবসার পুঁজি ২৮ লাখ ২২ হাজার টাকা হলেও ২০২২ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৫০ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৩ টাকায়। তিনি ২০২২ সালে কৃষিজমি ক্রয় করেন ৭ দশমিক ১৪ শতক। ২০২২ সালের ১৯ জুন জমি ক্রয় করেন ১০ শতক, যার রেজিস্ট্রি দলিল নম্বর ২৮৯৪। যার মোট মূল্য ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ৪৪০ টাকা। এর আগে ২০২১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এক দিনে যথাক্রমে ৯০০ শতাংশ, ৪০০ শতাংশ ও ৩৫০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। যার রেজিস্ট্রি দলিল নম্বর ৭৭৭০, ৭৭৭১ ও ৭৭৭২। তিনি আয়কর বিবরণী অনুযায়ী ২০২২ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৯৫ লাখ ৯৬ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ তিনি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দুটি ব্যাংকে অল্প পরিমাণ সম্পদ বন্ধক রেখে ১০ কোটি ৫০ লাখ ২৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর চরলক্ষ্যা গ্রামে প্রাইভেট কার ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় মামলায় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। গত ২৫ মার্চ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (দ্বিতীয় আদালত) মো. ইব্রাহিম খলিল এ আদেশ দেন। যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় তারা হলেন ফারুক চৌধুরী, ইয়াছিন আরাফাত, মো. মনির হোসেন, হাসমত আলী, হায়দার কবির আইনান, মো. বাহাদুর খান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।