জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, নদ-নদীর ক্রমাগত দূষণ, নাব্য সংকট এবং সীমান্তের ওপারে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের কারণে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি ও আশপাশের অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে এখন আর আগের মতো দেখা মিলছে না রুপালি ইলিশের ঝাঁক। সময় মতো নদীতে প্রবেশ করতে না পারায় ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনে। বছর জুড়ে চলা তাপপ্রবাহ, অপ্রতুল বৃষ্টিপাত, পানির স্বল্পতা, নদীর তলদেশ ভরাট এবং শিল্পবর্জ্য ও পলিথিনে দূষিত পানির কারণে এখন ইলিশের বিচরণের জন্য আর নদীর উপযুক্ত পরিবেশ নেই। আর এরই বিরূপ প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত ইলিশ উৎপাদনের পরিসংখ্যানে।
মৎস্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের মোট উৎপাদন হয়েছে ৫.২৯ লাখ টন। অথচ এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৫.৭১ লাখ টন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪২ হাজার টন, যা শুধু পরিসংখ্যানে নয়, মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর জীবিকাতেও বড় আঘাত হেনেছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বলছেন, ইলিশের জন্য আদর্শ পানির তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বর্তমানে নদ-নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত সপ্তাহে বরিশালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৩৮.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫.৩ ডিগ্রি বেশি। অতিরিক্ত এই গরম পানির স্তরে ইলিশ টিকতে পারে না; বাধ্য হয়ে গভীর সমুদ্রেই থেকে যাচ্ছে তারা।
শুধু উচ্চ তাপমাত্রাই নয়, নদ-নদীর নাব্য সংকটও দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পড়েছে, পানির প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। অনেক নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে, যা ইলিশের অভ্যন্তরীণ নদীতে প্রবেশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার যেখানে নদীর গভীরতা রয়েছে, সেখানে চলাচল করছে বড় নৌযান ও ট্রলারÑ যার শব্দ ও নড়াচড়ায় ইলিশ ভয় পেয়ে চলে যাচ্ছে অন্য দিকে। একই সঙ্গে, জেলেদের জন্যও সেসব এলাকায় মাছ ধরা দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
তাপপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর দূষণ। শিল্প কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, পলিথিন, পয়ঃপ্রণালির আবর্জনা এবং ময়লার স্তূপ নদীর পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। এর ফলে পানিতে থাকা ইলিশের প্রধান খাদ্য ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। যেখানে প্রতিলিটার পানিতে ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন থাকা দরকার, সেখানে এখন পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১,৫০০ বা তারও নিচে। জুপ্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণও কমে অনেক নদীতে ২০০-৩০০ পর্যন্ত নেমে এসেছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজেদুল ইসলাম গণম্যধ্যমে বলেছেন, ‘ইলিশের অবাধ বিচরণ ও প্রজনন নিশ্চিত করতে হলে আমাদের নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করতে হবে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’