পাল্টাপাল্টি হুমকির সঙ্গে বেড়েছে উত্তেজনাও

কূটনৈতিক তৎপরতায় সংঘাত থামলেও নিজেদের মধ্যে উত্তেজনা কমছে না ভারত ও পাকিস্তানের। যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ভারত-পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি হুমকি অব্যাহত রয়েছে। গত মঙ্গলবার পাঞ্জাব রাজ্যের আদমপুর বিমানঘাঁটিতে বিমানবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদ চালানো হলে আপনারা ধ্বংস হয়ে যাবেন। জবাবে পাকিস্তান বলেছে, ভবিষ্যতে নয়াদিল্লি আবার আগ্রাসন চালালে পাল্টা জবাব দিতে পিছপা হবে না ইসলামাবাদ। হুমকিমূলক বার্তার সঙ্গে বেড়েছে কূটনৈতিক উত্তেজনাও। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তুলে দুই দেশই একজন করে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক বহিষ্কার করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনার জেরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই চীনকে সতর্কবার্তা জানিয়েছে ভারত। সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি জায়গার নাম এককভাবে প্রকাশ করেছে চীন। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর গত সোমবার প্রথমবার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন মোদি। সে ভাষণে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পৃক্তার অভিযোগ তুলে কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। মোদি বলেন, সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের মদদ বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আবার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। এ সময় পারমাণবিক অস্ত্রের তোয়াক্কাও করা হবে না। ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই জানায়, যুদ্ধবিরতির পর মঙ্গলবার দ্বিতীয়বারের মতো জনসমক্ষে ভাষণ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এদিন ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের আদমপুর বিমানঘাঁটিতে বিমানবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদ চালানো হলে আপনারা ধ্বংস হয়ে যাবেন। মোদির এই ভাষণের নিন্দা জানিয়ে মঙ্গলবার পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মোদির দেওয়া ‘উসকানিমূলক ও উত্তেজনাকর’ বক্তব্য দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে ইসলামাবাদ। আঞ্চলিক শান্তিও স্থিতিশীলতার প্রচেষ্টার মধ্যে এমন বক্তব্য উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির যে সমঝোতা হয়েছে, পাকিস্তান সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে। এতে বলা হয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং উত্তেজনা কমাতে দরকারি পদক্ষেপ নেবে ইসলামাবাদ। তবে ভবিষ্যতে যদি ভারত কোনো আগ্রাসন চালায়, তাহলে তা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করা হবে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চললেও কূটনৈতিক উত্তেজনা এখনো থামেনি। এবার পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতীয় এক কূটনীতিককে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করেছে ইসলামাবাদ। কূটনীতির ভাষায় পাসোনা নন গ্রাটার অর্থ হচ্ছে ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’। ওই কূটনীতিককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ গতকাল বুধবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। তবে প্রতিবেদনে ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করা হয়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিধিবহির্ভূত কর্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে ইসলামাবাদে ভারতীয় হাইকমিশনের এক কর্মীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত জানাতে গতকাল মঙ্গলবার তাকে মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। এর আগে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দিল্লিতে নিযুক্ত পাকিস্তানের এক কূটনীতিককে বহিষ্কার করে ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই কর্মকর্তা ভারতে তার সরকারি অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলেন। তাই তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একটি পর্যালোচনার পর তার ‘জেড’ ক্যাটাগরি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি যুক্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে রাজধানী নয়া দিল্লিতে জয়শঙ্করের বাসভবন ঘিরেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দেশটির বার্তা সংস্থা পিটিআই বলছে, ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্প্রতি জয়শঙ্করের সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার পর এই সুপারিশ করে। ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, জয়শঙ্কর আগে থেকেই ‘জেড’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পেয়ে আসছেন। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সেসের (সিআরপিএফ) ৩৩ জন কমান্ডোর একটি দল সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছেন। ‘জেড’ ক্যাটাগরি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় দেশটির স্থানীয় পুলিশ ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের (এনএসজি) চার থেকে ছয়জন কমান্ডোসহ মোট ২২ জন সদস্য নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। সঙ্গে থাকে অন্তত একটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি। সঙ্গে এসকর্ট গাড়িও থাকে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই অরুণাচল প্রদেশ ইস্যুতে চীনকে সতর্কবার্তা দিয়েছে ভারত। সম্প্রতি ভারতের সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি জায়গার নাম এককভাবে প্রকাশ করেছে চীন। যে অঞ্চলগুলোর নামকরণ চীন করেছে, তার অধিকাংশই ভারতের মধ্যে। আর এসব এলাকা চীনের মানচিত্রে যুক্ত করেছে তারা। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বেইজিংয়ের এই প্রচেষ্টাকে ‘অকার্যকর ও হাস্যকর’ বলে অভিহিত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি যে চীন অরুণাচল প্রদেশের নতুন নামকরণের জন্য তাদের নিরর্থক ও অযৌক্তিক প্রচেষ্টা জারি রেখেছে। আমরা এই ধরনের তৎপরতা থেকে বেইজিংকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। পরে মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়, ভারতের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা চীনের এ ধরনের প্রচেষ্টাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, গত ১১-১২ মে অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি এলাকার নাম নতুন করে রাখে চীন। এরপর সেগুলো প্রকাশ করে চীনের সিভিল অ্যাভিয়েশন মিনিস্ট্রি। এর মধ্য দিয়ে ভারতের এই এলাকা আবারও নিজেদের দাবি করল চীন। এ নিয়ে অবশ্য বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।