ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় বড় সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। দোহায় চলমান যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেই ‘অপারেশন গিডিয়ন চ্যারিয়টস’ নামের এই অভিযানে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। গতকাল রবিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৩৫ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। এদিকে, সাময়িক যুদ্ধবিরতির নতুন প্রস্তাব এনেছে হামাস। গত শনিবার নতুন করে আলোচনার পর গাজায় যুদ্ধবিরতির নতুন চুক্তির অধীনে আরও জিম্মি মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে হামাস। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, দোহায় চলমান আলোচনায় জিম্মি মুক্তি নিয়ে একটি চুক্তির সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরায়েলি দল। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার বাসিন্দাদের লিবিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনসংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন প্রতিবেদন ‘সত্য নয়’ বলে জানিয়েছে ত্রিপোলির যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস।
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৪৪ জন গাজার দক্ষিণাঞ্চলে, উত্তরাঞ্চলে ৪২ জন এবং মধ্যাঞ্চলে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন চার সংবাদকর্মীও। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র খলিল আল-দেকরান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, অবরুদ্ধ ভূখণ্ডটিতে ভোর থেকে চলা এই নৃশংসতায় অনেক পরিবার নাগরিক নিবন্ধন তালিকা থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে। ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযান সম্প্রসারিত করার পর থেকে গাজার উত্তরাঞ্চলীয় জাবালিয়া সবচেয়ে মারাত্মক হামলাগুলোর একটি ঘটতে দেখা গেছে। ইসরায়েল গাজার খান ইউনিস শহরের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের তাঁবুগুলোতেও হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গাজার সবশেষ চিকিৎসাকেন্দ্রটিও বন্ধ হয়ে গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ইন্দোনেশিয়া হাসপাতালকে লক্ষ্য করে বোমাবষর্ণের কারণে এর ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের কর্মীদের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, সাময়িক যুদ্ধবিরতির নতুন প্রস্তাব এনেছে হামাস। গত শনিবার নতুন আলোচনার পর গাজায় যুদ্ধবিরতির নতুন চুক্তির অধীনে আরও জিম্মি মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে হামাস। এই প্রস্তাব অনুসারে, গোষ্ঠীটি তাদের হাতে থাকা জিম্মিদের অর্ধেককে মুক্তি দেবে। বিনিময়ে গাজায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। ইসরায়েলি বাহিনী গাজা উপত্যকায় নতুন করে বড় ধরনের হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরেই এই আলোচনা শুরু হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে হামাস ৯ জিম্মিকে মুক্তি দিতে রাজি হয়েছে। স্কাই নিউজ আরাবিয়ার এক প্রতিবেদনেও একই ধরনের প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানান, নতুন চুক্তির প্রস্তাব অনুসারে, গাজায় প্রতিদিন ৪০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি এবং গাজা থেকে চিকিৎসার জন্য রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার কথাও রয়েছে। জানা গেছে, হামাসের এই প্রস্তাবের পর ইসরায়েল অবশিষ্ট সব জিম্মির জীবিত থাকার প্রমাণ ও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। যুদ্ধবিরতি আলোচনার এই নতুন দফা কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দোহায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় বিকেলে এটি শুরু হয়।
প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে ইসরায়েল এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, দোহায় চলমান আলোচনায় জিম্মি মুক্তি নিয়ে একটি চুক্তির সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরায়েলি দল। আলোচনায় যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবিবার নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দোহায় আমাদের আলোচক দল একটি চুক্তির সব সম্ভাবনা যাচাই করে দেখছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের প্রস্তাব অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও সীমিত জিম্মি বিনিময় বা সব জিম্মির মুক্তি, হামাস যোদ্ধাদের দেশত্যাগ ও গাজার নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নেতানিয়াহুর সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের নীতির কারণে এখন পর্যন্ত ১৯৭ জন জিম্মিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৫৮ জনের ক্ষেত্রেও সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আল-হাদাত ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ সিনওয়ারের মরদেহ পাওয়ার খবর জানিয়েছে। গত সপ্তাহে খান ইউনিসে মোহাম্মদ সিনওয়ারকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় দখলদার সেনারা। আল-হাদাত আরও জানিয়েছে, মোহাম্মদ সিনওয়ারের সঙ্গে তার আরও ১০ সঙ্গীর মরদেহ পাওয়া গেছে। হামাসের সাবেক প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ছোটভাই ছিলেন মোহাম্মদ সিনওয়ার। গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝিতে গাজার রাফার তেল সুলতানে দখলদার ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ হারান ইয়াহিয়া। তার মৃত্যুর পর মোহাম্মদ সিনওয়ার হামাসের নেতৃবৃন্দের শীর্ষস্থানে চলে আসেন। তিনি হামাসের সামরিক শাখা ছাড়াও গাজার প্রধানের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার বাসিন্দাদের লিবিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেএমন একটি সংবাদকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ত্রিপোলির যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। গতকাল রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে দূতাবাস এ তথ্য জানায়। ওই পোস্টে বলা হয়, গাজার অধিবাসীদের লিবিয়ায় স্থানান্তরের যে খবর সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা ভিত্তিহীন। এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে দাবি করা হয়ট্রাম্প প্রশাসন গাজার প্রায় ১০ লাখ মানুষকে স্থায়ীভাবে লিবিয়ায় স্থানান্তরের একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। প্রতিবেদনে পাঁচটি সূত্রের বরাতে এ দাবি করা হয়, যাদের মধ্যে দুজন সরাসরি বিষয়টির সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়। এ নিয়ে এখনো লিবিয়ার ত্রিপোলিভিত্তিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জাতীয় ঐক্যের সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।